পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/১৮৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১৬২ বিভূতি-রচনাবলী শুধুই মনে হয় সেই ভাগলপুরে নিমগাছের দিকের ঘরটাতে বসে বনাতমোড়া সেই টেবিলটাতে সেই সব লেখা—সেই কার্তিক, সাবের স্টেশনে গাছের তলায় শীতকালে পাতা জালিয়ে আগুন-পোহানো, গঙ্গার ধারের বাড়িটার ছাদে কত স্তব্ধ অন্ধকার রজনীর চিস্তাশ্রম, সেই কাশবনে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে যেতে সে-সব ছবি—সবারই আজ পরিসমাপ্তি ঘটল। উ:, গত ছ'মাস কি খাটুনিটাই গিয়েচে! জীবনে কখনও বোধহয় আমি এরকম পরিশ্রম করিনি—কখনও না। ভোর ছ’টা থেকে এক কলমে এক টেবিলে বেল পাঁচটা পর্যন্ত কাটিয়েচি। মাথা ঘুরে উঠেচে, তখন একটু ট্রামে হয়তো বেড়াতে বেরিয়েচি, ইডেন গার্ডেনে কেয়াঝোপে বসে ও একদিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে লালফুল-ফোটা বিলটার ধারে বসে কত সংশোধনের ভাবনাই ভেবেচি। তার ওপর কাল গিয়েচে সকলের চেয়ে খাটুনি। সকাল ছ’টা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত বই-এর শেষ ফর্মার প্রফ ও কাটাকুটি, শেষে রাত্রে পাথুরেঘাটার বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়া ও তদারক করে লোক খাইয়ে বেড়ানো। কাল রাত্রে ভাল ঘুম হয়নি, গা হাত-পা যেন কামড়াচ্চে। যাক। বই বেরুবে বুধবারে। ভগবান বলতে পারবেন না যে ফাকি দিয়েচি, তা ষে দিইনি, তিনি অন্তত: সেটা জানেন । লোকের ভাল লাগবে কিনা জানি না, আমার কাজ আমি করেচি। (ওপরের সব কথাগুলো লিখলুম আমার পুরনো কলমটা দিয়ে,—যেটা দিয়ে বইখানার শুরু হতে লেখা। শেষদিকটাতে পার্কার ফাউণ্টেন পেন কিনে নতুনের মোহে একে অনাদর করেছিলুম, ওর অভিমান আজ আর থাকতে দিলুম না। ) আজ বই বেরুল। এতদিনের সমস্ত পরিশ্রম আজ তাদের সাফল্যকে লাভ করেচে দেখে আমি আনন্দিত। প্রবাসী অফিসে বসে এই কথাই কেবল মনে উঠছিল যে আজ মহালয়, পিতৃতর্পণের দিনটা, কিন্তু আমি তিলতুলসী তর্পণে বিশ্বাসবান নই—বাবা রেখে গিয়েছিলেন র্তার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করবার জন্তে, তাই যদি করতে পারি, তার চেয়ে সত্যতর কোনো তপণের খবর আমার জানা নেই। আজ এই নির্জন, নীরব রাত্রিতে বহু দূরবর্তী আমার সেই পোড়ো ভিটার দিকে চেয়ে এই কথা মনে হোল যে তার প্রতি সন্ধ্যা, প্রতি বৈকাল, প্রতি জ্যোৎস্নামাখা রাত্রি, তার ফুল, ফল, আলো, ছায়া, বন, নদী—বিশ বৎসর পূর্বের সে অতীত জীবনের কত হাসি কায়া ব্যথা বেদনা, কত অপূর্ব জীবনোল্লাসের স্মৃতি আমার মনকে বিচিত্র সৌন্দর্যের রঙে রঞ্জিয়ে দিয়েছিল। আমার সমস্ত সাহিত্য-স্থষ্টির প্রচেষ্টার মূলে তাদেরই প্রেরণা, তাদেরই স্বর। আজ বিশ বৎসরের দূরজীবনের পার হতে মামি আমার সে পাখী-ডাক, তেলাকুচ-ফুল ফোট, ছায়াভরা মাটির ভিটাকে অভিনন্দন কয়ে এই কথাটি শুধু জানাতে চাই— ভূলিনি। তুলিপি , যেখানেই থাকি ভুলিনি “তোমারই কথা লিখে রেখে যাবে।— সুদীর্ঘ অনাগত দিনের বিভিন্ন ও বিচিত্র সুরসংযোগের মধ্যে তোমার মেঠো একতারার উদার, অনাহুত ঝঙ্কারটুকু যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।