পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৩০০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


२१8 বিভূতি-রচনাবলী বছর কয়েক আগে আমি তখন একটা স্বদেশী ব্যাঙ্কের শেয়ার বিক্রি ও প্রচারের কার্যে ঢাকা যাই। সেই প্রথম ও-অঞ্চলে যাওয়া । সময়ট শীতের শেষ হলেও কলকাতার ধারণার আমি শীতের কাপড় সঙ্গে নিয়ে যাইনি বলে একদফা পদ্মার স্টীমারে, তারপর ট্রেনে শীতে হি হি করে কাপতে কঁপিতে রাত সাড়ে ন’টা দশটার সময় গিয়ে ঢাকায় পৌঁছলাম। আমাদের ব্যাঙ্কের একজন ডিরেক্টার ঢাকা শহরের এক ভদ্রলোকের নামে একখানা পরিচয়পত্র দিয়েছিলেন। তিনি শহরের একজন বড় উকীল—নাম এখানে করবার আবশ্যক নেই—ৰ্তারই বাসায় গিয়ে উঠবো এরকম কথা ছিল। 歇 আমি যখন সে বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে দশটার কম নয়। বেশ জ্যোৎস্না রাত, কম্পাউণ্ডের বা ধারে ফুল-বাগান, জাফরিতে মাধবীলতা একে-বেঁকে উঠেছে—আলোআঁধারে পাতার আড়ালে বড় বড় ব্ল্যাকপ্রিন্স গোলাপ ফুটে রয়েছে—এসব গাড়িতে বসেই কৌতুহলের সঙ্গে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। গাড়ি থামতেই একজন হিন্দুস্থানী দারোরান রুটি সেকা ফেলে গাড়ির কাছে এসে সেলাম করে দাড়াল। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম উকীলবাবু কি কাজে কুমিল্লাতে গেছেন, আজ তিন চারদিন বাড়ি ছাড়া, কবে আসবেন তার ঠিক নেই। কোচম্যানকে গাড়ি ফেরাতে বলেছি—ডাক বাংলোতেই অগত্যা উঠবো—একটি ছেলে বাড়ির মধ্যে থেকে বার হয়ে এল । সঙ্গে সঙ্গে সেই দারোয়ানটিও এল—সে যে ইতিমধ্যে কখন বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিল আমি লক্ষ্য করিনি। ছেলেটি বললে—বাবা কাল সকালেই আসবেন, আপনি যাবেন না—শুনলে বাবা দুঃখ করবেন। রামদীন, বাবুর জিনিসপত্র নামিয়ে নাও । সুতরাং রয়ে গেলাম । আহার ও শয়নের ব্যবস্থা সুন্দর হোল, সারাদিনের পরিশ্রমে শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে উঠে বাইরের বারান্দাতে বসে’ কাগজ পড়ছি, গৃহস্বামীর গাড়ি সদর গেট দিয়ে কম্পাউণ্ডের মধ্যে ঢুকলো। আজ সকালের ট্রেনেই উকীলবাবুর আসবার কথা ছিল— তাই তার গাড়ি স্টেশনে গিয়েছিল তাকে আনতে। গৃহস্বামী গাড়ি থেকে আমায় দেখে নেমে আমার পরিচয় জেনে খুব খুশী হলেন । নানাভাবে আপ্যারিত করলেন, রাত্রে কোন কষ্ট হয়েছে কিনা সেকথাটা অন্ততঃ দশবার এমনভাবে জিজ্ঞাসা করলেন যে মনে হোল রাত্রে কষ্ট হয়নি বললে তাকে হতাশ করা হবে। একদিনের মধ্যে আমি যেন বাড়ির লোক হয়ে পড়লাম সে বাড়িতে। রাত্রে আমার আহারের স্থান হোল বাড়ির মধ্যের দাওয়ায় । পরদিন সকালে আমার বাইরের ঘরে একটি বারো-তেরো বছরের সুন্দরী মেয়ে চা ও খাবার নিয়ে এল। বেশ ডাগর-ডাগর চোখ, কালে চুলের রাশ পিঠের ওপর পড়েছে, মুখ দেখে বুদ্ধিমতী মনে হয়। চা ও খাবারের পাত্রটা টেবিলের ওপর রেখে সে চলে যাচ্ছিল, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—তুমি বুঝি খুকী এবাড়িরই না ? নাম কি তোমার ? সে হেলে বললে—ীণা। তারপরই সে চলে গেল।