পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৩৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক vరి(t) অঞ্চলে শহরের টানে ক্রিয়াকর্মের খাওয়ানো ব্যাপারে যে সব শৌখিনতা ও বিলাসিভা এসে পড়েচে, বরিশাল জেলায় একটি মুদূর পল্লীগ্রামে সে সব থাকবার কথা নয়, সন্দেশ রসগোল্লার পরিবর্তে তাই এখানে নারিকেলের নাড় আরপকার মেঠাই দিলেও নিন্ম হয় না। আর একটি জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম ওখানে, প্রায় সকলেই ছাদা নিয়ে যায় এবং যেতে অভ্যস্ত, তাতে কোন সঙ্কোচ নেই কারো—প্রায় প্রত্যেকেই বলে যে পরিমাণ খেলে, সেই পরিমাণ মেঠাই নাড়, গামছায় কি চাদরে বেঁধে নিয়ে এল। আমাদের দেশে এ প্রথা আগে যথেষ্ট প্রচলিত ছিল, এখন আর কেউ ছাদা বাধে না— শহরের টানে এ প্রথা একেবারে উঠে গিয়েচে । পূর্ণিমার রাত্রে আবার খালপথে ওখান থেকে এলুম বরিশালে—সারারাত্রি জ্যোৎস্নালোকিত মাঠ, তারা আর শঠির বনের শোভা দেখতে দেখতে ফিরলুম। ঝালকাঠি বলে একটা বড় গঞ্জ আছে বরিশাল জেলার মধ্যে। এখান থেকে একটা স্টীমার ফ্রেজারগঞ্জ পর্যন্ত যায় সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে। আমার যাওয়ার কথা ছিল মরেলগঞ্জ। অনেকে বললে ওখানে সুন্দরবনের অনেকখানিই দেখা যাবে। ঝালকাঠিতে এলুম সেই উদেখে । বরিশাল অঞ্চলে এমন জায়গাকে বলে ‘বন্দর। বাংলাদেশের গৃহস্থাপত্য কোনো কালেই ভালো নয় বলে আমার ধারণা, আজকাল কলকাতা" বা ছোট-বড় শহরে আধুনিক গৃহস্থাপত্যের যে নিদর্শন দেখা যায়, তাদের ছাঁচ এদেশী নয় সকলেই জানেন । ঝালকাঠিতে এসে এখানকার বাড়িঘর দেখে মন এমন দমে গেল— এতটুকু সৌন্দর্যবোধ থাকলে কেউ এ ধরনের বাড়ি করে না। এত বড় গঞ্জ, কিন্তু এখানে প্রায় সব বাড়িই করোগেট টিনের—কি ব্যবসা বাণিজ্যের গুদামঘর, কি গৃহস্থবাড়ি। ফলে দোকান, গুদাম ও ভদ্রাসন বাড়ির একই মূর্তি। তারপর অবিপ্তি লক্ষ্য করেচি পূর্ববঙ্গের প্রায় সর্বত্রই এই টিনের ছাউনির চলন হয়েছে আজকাল। খড়ের ঘরের যে শাস্ত শ্ৰী আছে, টিনের ঘরের তা নেই, বরং টিনের চেয়ে লাল টালির ঘরও অনেক ভালো দেখতে। ঝালকাঠিতে বেশ অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বাড়িও দেখেছি টিনের ছাউনি। বাড়ির সামনে এক-আধটু ফুলের বাগান কি মুদৃপ্ত দু-একটা গাছপালাও কেউ শখ করে করেনি। টিনের ঘরের পাশে তা থাকলেও অন্তত বাড়ির কর্কশ রূক্ষত একটু দূর হয়—কিন্তু ফুলের বালাই নেই কোন বাড়িতে। এক জায়গায় কেবল আছে দেখেছিলুম, তাও কলকাতার টানে। নদীর ধারে ভূকৈলাসের জমিদারদের প্রকাও কাছারিবাড়ি আছে—খুব বড় বড় থামওয়াল সেনেট হাউসের মত চওড়া ধাপওয়ালা বাড়ি—এই টিনের ঘরের রাজ্যে এ বাড়িখান দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ঝালকাঠি আমার ভাল লেগেছিল অল্প দিক থেকে । অামাদের গ্রামে নেপাল মাঝি বলে একজন লোক ছিল আমার ছেলেবেলার, সে অত্যন্ত সামান্ত অবস্থা থেকে ব্যবসা করে হাতে বিলক্ষণ দ্বপরলা করেছিল। তার মুখে ঝালকাঠির কথা খুব শুনতাম।