পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অপরাজিত ১৩ উঠিল। অপূর্ব অদ্ভুত, মুতীব্র; মিনমিনে ধরণের নয়, পানলে পালে জোলে ধরণের নয়। অপুত্র মন সে শ্রেণীরই নয় আদেী, তাহা সেই শ্রেণীর যাহা জীবনের সকল অবদানকে, ঐশ্বর্ধকে প্রাণপণে নিড়োইয়া চুৰিয়া আঁটিসার করিয়া খাইবার ক্ষমতা রাখে। অল্পেই নাচিয় ওঠে, অল্পে দমিয়াও যায়—যদিও পুনরায় নাচিয়া উঠিতে বেশী বিলম্ব করে না। মনসাপোতা গ্রামে যখন গাড়ি চুকিল তখন বেলা দুপুর। সর্বজয়া ছইয়ের পিছন দিকের ফাক দিয়া চাহিয়া দেখিতেছে তাহার নূতনতম জীবনযাত্রা আরম্ভ করিবার স্থানটা কি রকম। তাহার মনে হইল গ্রামটাতে লোকের বাস একটু বেশী, একটু যেন বেশী ঠেলাঠেলি, ফাকা জায়গা বেশী নাই, গ্রামের মধ্যে বেশী বনজঙ্গলের বালাইও নাই। একটা কাছাদের বাড়ি, বাহির-বাটীর দাওয়ায় জনকয়েক লোক গল্প করিতেছিল, গোরুর গাড়িতে কাহারা আসিতেছে দেখিয়া চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে লাগিল। উঠানে বঁাশের আলনায় মাছ ধরিবার জাল শুকাইতে দিয়াছে। বোধ হয় গ্রামের জেলেপাড়া । আরও খানিক গিয়া গাড়ি দাড়াইল । ছোট উঠানের সামনে একখানি মাঝারি গোছের চালা ঘর, দুখান ছোট দোচালা ঘর, উঠানে একটা পেয়ার গাছ ও একপাশে একটা পাতকুয়া। বাড়ির পিছনে একটা তেঁতুল গাছ—তাহার ডালপালা বড় চালাঘরখানার উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। সামনের উঠানটা বাশের জাফরি দিয়া ঘেরা। চক্রবর্তী মহাশয় গাড়ি হইতে নামিলেন। অপু মা’কে হাত ধরিয়া নামাইল । চক্রবর্তী মহাশয় আসিবার সময় যে তেলিবাড়ির উল্লেখ করিয়াছিলেন, বৈকালের দিকে তাহাঁদের বাড়ির সকলে দেখিতে আসিল। তেলি-গিল্পী খুব মোট, রং বেজার কালে । সঙ্গে চার পাঁচটি ছেলেমেয়ে, দুটি পুত্রবধূ। প্রায় সকলেরই হাতে মোটা মোটা সোনার অনন্ত দেখিয়া সর্বজয়ার মন সন্ত্রমে পূর্ণ হইয়া উঠিল। ঘরের ভিতর হইতে দুখান কুশাসন বাহির করিয়া আনিয়া সলজ্জভাবে বলিল, আমুন আমুন, বসুন। তেলিগিৰী পায়ের ধূলা লইয়া প্রণাম করিলে ছেলেমেয়ে ও পুত্রবধুরাও দেখাদেখি তাহাই করিল। তেলি-গিৰী হাসিমুখে বলিল, দুপুরবেলা এলেন মা-ঠাকরুণ একবার বলি যাই। এই ষে পাশেই বাড়ি, তা আসতে পেলাম না। মেজছেলে এল গোয়াড়ী থেকে—গোয়াড়ী দোকান আছে কি-না ! মেজ বৌমার মেয়েট স্বাওটো, মা দেখতে ফুরসৎপায় না, দুপুরবেলা আমাকে একেবারে পেয়ে বলে—ঘুম পাড়াতে পাড়াতে বেলা দুটাে। ঘুঙুড়ি কাশি, গুপী কবরেজ বলেছে ময়ূরপুচ্ছ পুড়িয়ে মধু দিয়ে খাওয়াতে। তাই কি সোজাসুজি পুড়লে হবে মা, চৌষষ্টি ফৈজৎ—কাসার ঘটির মধ্যে পোরে, তা ঘুটের জাল করে, তা টিমে অঁাচে চড়াও । হ্যারে হাজরী, ভোদা গোয়াড়ী থেকে কাল মধু এনেছে কি-না জানিস্ ? আঠারো উনিশ বছরের একটি মেয়ে ঘাড় নাড়িয়া কথার উত্তর দিবার পূর্বেই তেলি-গিয়ী তাহাকে দেখাইয়া বলিল, ওইটি আমার মেজ মেয়ে—বহরমপুরে বিয়ে দিয়েচি। জামাই বড়বাজারে এদের দোকানে কাজকর্ম করেন। নিজেদেরও গোলা, দোকান রয়েচে কালনা— বেয়াই সেখানে দেখেন শোনেন। কিন্তু হলে হবে কি মা—এমন কথা ভূভারতে কেউ কখনো