পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪০০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিভূতি-রচনাবলী ۹8 رای অনেক রকমের পুষ্পের মধ্যে সাদা সাদা কি এক ধরনের ফুল ছোট-বড় সব গাছের মাথা ছেয়ে রেখেচে ; কোনো লতার ফুল হবে, কিন্তু লতা আমার চোখে পড়লে না। খুব ঘন সুগন্ধ সে ফুলের, যে যে গাছের মাথায় সে ফুলের মেলা, তার তলা দিয়ে যাবার সময় উগ্র মুবাসে মাথার মধ্যে যেন ঝিন ঝিম করে, আমি ইচ্ছে করে থানিকট দাড়িয়ে থেকে দেখেচি. মনে হয় যেন শরীর টলচে । একটি জায়গায় সৌন্দর্যের ছবি মনে গভীর দাগ কেটে রেখে গিয়েচে । পথের ধীরে একটি পাহাড়ী নদী, মাথার ওপর সেখানে আকাশ দেখা যায় না, বড় বড় বনস্পতিদের শাখাপ্রশাখার মেলা, মোট লতা ঝুলে জলের ওপর পর্যন্ত পৌঁছেচে, বাঁদিকের বন এত ঘন যে কালো-মও দেখাচ্চে, ডানদিকে জলের ওপরে শিলাখণ্ডের অগ্রভাগ জেগে আছে । রাস্তাটা ওপার থেকে এসেচে টেরচা ভাবে, বনের মধ্যে ঘুরে ফিরে নদীর ধারে এসে যেন হঠাৎ খানিকট ঢালু হয়ে নেমে নদীগর্তে ঢুকেচে । সেই দিকটা এপার থেকে দেখাচ্চে যেন চীন চিত্রকরের হাতে আঁকা ছবির মতো। একটা শিলাখণ্ডের ওপর বসে সেই দৃপ্ত কতক্ষণ উপভোগ করলুম একমনে, আমার সঙ্গী ডাকপিয়াদ এখানে জলে স্নান করতে নামলো। নদী চওড়া হবে হাত-কুড়ি কি বাইশ। হেঁটে পার হতে হয় অবিশুি, হাটুজলের বেশি নেই কোথাও । আমরা যখন বসে, তখন ওপার থেকে পাচ ছ-জন লোক একজন সন্ত্রাস্ত ব্ৰহ্মদেশীয় মহিলাকে সিডান চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে এসে জলে নামলো । আমার সঙ্গী ডাকপিয়াদা সিডনি চেয়ার কখনো দেখেনি, ই করে চেয়ে রইল। শুনলুম এদেশে এ জিনিসের প্রচলন নেই, রবার-বাগানওয়ালা ধনী লোকেরা চীন ও মালয় উপদ্বীপ থেকে এর আমদানি করেচে। মহিলাটি যখন জল পার হলেন চেয়ারে বসে, তখন লক্ষ্য করলুম সাধারণ বর্মিজ মেয়ের তুলনায় তিনি অনেক বেশি সুন্দরী। এমন কি, আমার মনে হল, গায়ের রং বর্মিজদের মতে নয়, গোলাপী অভিা ধপধপে সাদার ওপর। আমার সঙ্গী জলে নেমে স্নান করছিল, সে তাড়াতাড়ি জল থেকে উঠে পড়লো । এ ধারে এসে সিডান চেয়ারের বাহকের চেয়ার নামিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলে। মহিলাটি এবার কৌতুহলপূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলেন। আমিও চেয়ে দেখলুম; বেশ সুন্দর মুখশ্ৰী। পরে সিংস্কুতে জিজ্ঞেস করে আমি জেনেছিলুম তিনি বর্মিজ নন, সান দেশীয় মেয়ে। সান মহিলারা সাধারণত ব্ৰহ্মদেশীয় মেয়েদের চেয়ে দেখতে অনেক মুন্দরী। মহিলাটি জনৈক ইউরোপীয় রবার-বাগানের মালিকের বিবাহিতা পত্নী, অনেক টাকার মালিক ওঁর স্বামী । ওঁরা প্রায় আধঘণ্ট। খেয়াঘাটে বসে রইলেন, আমার সঙ্গী ডাকপিয়াদ আরও দূরে গাছ পালার আড়ালে গিয়ে স্নান সেরে এল । সেদিনই ওখান থেকে সিংস্কুর দিকে ফিরলাম।