পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪০২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩৭৬ বিভূতি-রচনাবলী মডু থেকে চাটগ ফিরে আমার পূর্বপরিচিত সেই ভদ্রলোকের বাড়িতে এসে উঠলুম। এই উপলক্ষে একটা কথা আমার এখনও মনে আছে। চট্টগ্রাম আমার কাছে তো বহুদূর বিদেশ, কিন্তু যখন ডবল মুরিংস্ জোট থেকে ঘোড়ার গাড়ি করে ওদের বাড়ি যাচ্চি, তখন মনে হল যেন অনেকদিন পরে বাড়ি ফিরলুম। ওদের সেই বৈঠকখানার পাশেই মুলী বাঁশের চাচে ছাওয়া ছোট ঘরখানি আমার কত প্রিয় পরিচিত হয়ে উঠেছিল, যেন আমায় কতদিনের গৃহ সেটি। উঠানের বাভাবিলেবু গাছের ছায়া যেন কতকালের পরিচিত আশ্রয় । পথে পথে অনেকদিন বেড়িয়ে এই ব্যাপারটি আমি লক্ষ্য করেচি, মন যেখানে এতটুকু আশ্রয় পায় সেইখানেই তার আঁকড়ে ধরে থাকবার কেমন একটা আগ্রহ গড়ে ওঠে। সে আশ্রয় যখন চলে যায় তখন মন আশ্রয়ান্তরে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে অত্যন্ত সহজে ও অবলীলাক্রমে। একটা ছবি আমার এই সম্পর্কে বহুদিন মনে ছিল। যখন চাটগ আসচি স্টীমারে, দূর থেকে দেখতে পেলাম কর্ণফুলির মোহনার বাইরে সমুদ্রের মধ্যে একখানা বড় পালতোলা জাহাজ নোঙর করা আছে । নীল সমুদ্রের মধ্যে বহুদূর থেকে জাহাজখানা দেখাচ্চে যেন একটি দ্বীপের মতে, যেন অকূল সমুদ্রের কুলে দু:খসুখবিজড়িত একটি ক্ষুদ্র গৃহকোণ, তার সাদা ভাজকরা গোটানো পালগুলো, লম্বা লম্বী মাস্তলগুলো আর মস্ত বড় কালো খোলটা আমার মনে বহুদিন স্থায়ী রেখাপাত করেছিল। চাটগারে ওদের বাড়ি আসতে ওরা আমাকে সাগ্রহ অভ্যর্থনা করলে—মুলী বাশে ছাওয়া সেই ছোট ঘরটাতে আবার বিছানা পেতে দিলে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্তে মডু থেকে বৰ্মিজ পুতুল ও খেলনা এনেছিলুম—তারা সেগুলো পেয়ে খুব খুশী। একদিন বাড়ির কর্তা বললেন, চলুন সীতাকুণ্ড যাবেন ? আপনি তো চন্দ্রনাথ যাননি, অমনি চন্দ্রনাথও ঘুয়ে আসবেন, এ অঞ্চলে এসে চন্দ্রনাথ না দেখলে বাড়ি ফিরে লোককে বলবেন কি ? পরদিন সকালের ট্রেনে দুজনে গিয়ে নামলুম সীতাকুণ্ডে । বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম আসবার পথে একদিন এই চন্দ্রনাথ পাহাড়কে দূর থেকে দেখেছিলুম, তখন মনে ভেবেছিলুম চাটগা পৌঁছেই আগে চন্দ্রনাথ দেখতে হবে। অন্ত কাজে ব্যস্ত থাকায় তা আর তখন হুরে ওঠেনি । আজ দেরাং আর আরাকান ইয়োম পর্বত-শ্রেণী ও অরণ্যভূমি বেড়িয়ে এসে চন্দ্রনাথ পর্বতকে নিতান্ত উইঢিবির মতো মনে হচ্চে। হাজার দেড় কি সতেরোশ ফুট উচু পাহাড় আবার কি একটা পাহাড় নাকি । কিন্তু এ ভুল আমার পরে ভেঙেছিল, সে কথা বলচি। সীতাকুও গ্রামের মধ্যে কর্তার পরিচিত এক পাণ্ডার বাড়ি গিয়ে দুজনে উঠলাম। আমার সী এ অঞ্চলে একজন বিখ্যাত লোক ও জমিদার, সীতাকুগু গ্রামে তার নিজের একখানা