পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪০৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিষাত্রিক ©ꬃፄ বাগানবাড়ি আছে, অপরিষ্কার হয়ে পড়ে আছে বলে সেখানে ওঠা হয়নি—এই পাগুটি এর আশ্রিত ও অম্বুগত ব্যক্তি, তাই এখানেই ওঠা হল—তীর্থ করে পুণ্য অর্জন করবার জন্তে নয়। পাণ্ডাঠাকুর অবপ্তি বাঙালী ব্রাহ্মণ, আমার বললে,—পাহাড়ে উঠবেন না ? চলুন নিয়ে पॉई আমার সঙ্গী হেসে বললেন—তোমায় নিয়ে যেতে হবে না ঠাকুর মশাই। উনি নিজেই যেতে পারবেন, অনেক পাহাড় জঙ্গল ঘুরেচেন একা—তোমাদের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে এক যেতে আটকাবে না ওঁর । পাণ্ডাঠাকুরের প্রাপ্য তাহলে মারা যায়—সে তা ছাড়বে কেন। আমাকে নিয়ে সে পাহাড়ে উঠলো। চন্দ্রনাথের বৃক্ষলতার শোভা আমার মন মুগ্ধ করলে ওঠবার পথে, বিরূপাক্ষ মন্দির ছাড়িয়েই। অনেক বড় লোক পাহাড়ে ওঠবার সিড়ি তৈরি করে দিয়েচে নিজেদের পরলোকগত আত্মীয়দের স্মৃতিরক্ষার জন্তে, মার্বেল পাথরের ফলকে তাদের নাম ধাম লেথা আছে, আমার তো খুব ভালো লাগছিল প্রত্যেকথানি মার্বেল পাথরের ফলক পড়তে, ওঠবার সময় অনেক দেরি হয়ে গেল সেজন্তে । বিরূপাক্ষ মন্দির ছড়িয়ে অনেক দূর উঠে একটা পাহাড়ী ঝরনা নেমে আসচে, সেখান থেকে পথ দুভাগে ভাগ হয়ে দুদিক দিয়ে ওপরে উঠচে। এই পর্বতে উঠে হঠাৎ পিছন ফিরে চেয়েই দেখি নীল সমূদ্র ও সন্দ্বীপের অস্পষ্ট সবুজ তটরেখা। সেখানে বাধানে সিড়ির ওপরে বসে রইলুম খানিকট। সামনের পার্বত্য ঝরনার কুলু কুলু ধ্বনি, বন-ঝোপের ছায়া, বন-কুমুমের স্ববাস ও দূরের নীল সমুদ্রের দৃপ্ত যেন চোখের সামনে এক মায়ালোকের স্থষ্টি করেচে, উঠতে ইচ্ছে হয় না। পাও বললে, বড় দেরি হয়ে যাবে বাবু, চলুন ওপরে। আবার দুজনে ওপরে উঠতে লাগলুম। নিবিড় মূলী বাঁশের বন, গাছ পাগ ও লতা ঝোপের বিচিত্র সমাবেশ । মাঝে মাঝে ঝরনা নেমে আসচে বড় বড় পাথরের পাশ কাটিয়ে, মাঝে মাঝে বনের ফাক দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্চে, মাঝে মাঝে আড়াল পড়চে বন-ঝোপের । চন্দ্রনাথে পাহাড়ের দৃপ্ত এদিক দিয়ে অন্ত অনেক পার্বত্য দৃশ্ব থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। অন্ত সব জায়গায় পাহাড় আছে, কিন্তু হয়তে বনানী নেই ; যদিও বন থাকে তবে একঘেয়ে বন। একই গাছের, ইংরেজিতে যাকে বলে homogenous forest, যেমন আছে সিংডুম, মানভূম, সারেও প্রভৃতি অঞ্চলে। সে বনের বৈচিত্র্য নেই, মনকে তত আনন্দ দেয় না, চোখকে তত তৃপ্তি দেয় না । আরাকান ইয়োম পর্বতের বনভূমি যে প্রকৃতির, চন্দ্রনাথ পাহাড়ের বনও সেই একই প্রকৃতির, বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই ; কেবল মাত্র এইটুকু যে, পূর্বোক্ত অরণ্যে বনস্পতিজাতীয় ফার্ণ যথেষ্ট, চন্দ্রনাথের বনে ও-জাতীয় ফার্ণ আদৌ নেই। তাছাড়া এমন পাহাড়, বনানী ও সমুঞ্জের একত্র সমাবেশ আর কোথাও দেখা যাবে না