পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৪৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক 8〉ふ সাধারণত ডন রোজ, হনি-সাক্ল প্রভৃতি লতানে গাছ Pergolaর মাচায় উঠিয়ে দেওয়া হয়। আজকাল পশ্চিম চীন থেকে আমদানি ক্লিমাটি আরামাণ্ডি নামক সুগন্ধিপুপযুক্ত লতার খুব আদর। তা ছাড়া যাকে বলে স্যাণ্ডউইচ, আইল্যাণ্ড ক্রীপার, সে-জাতীয় পুম্পিত লতার ও খুব চল হয়েচে এই উভয়ঞ্জাতীয় ঝোপ রচনার কাজে । Beaumoutia grandiflora নামক এক প্রকার লতানে গাছও ব্যবহৃত হয়ে থাকে । আমি বিখ্যাত উদ্যানশিল্পী সার এডউইন লুটেনসের রচিত একটি ঝোপের ছবি দেখেছিলুম কয়েক বৎসর পূর্বে, তাতে যে শিল্পপ্রতিভা ও মুকুমার সৌন্দর্যজ্ঞানের পরিচয় ছিল, মন থেকে সে ছবি কখনও মুছে যাবার নয়। এই সব বাগানের ঝোপ যন্ত পুরানো হবে, ততই তার দাম হয়। লতা আরও নিবিড় হয়ে ওঠে, গ্রীষ্মমণ্ডলের বন থেকে আমদানি কাষ্ঠযুক্ত লায়ানগুলি খুব মোটা হয়, স্বন্দরী তরুণীর মুখের আশেপাশের কুঞ্চিত অগোছালো অলকদমের মতে তাদের নতুন গজানো আগডালগুলি Pergola ও Arbour-এর মাচা ছাড়িয়ে দুপাশে ঝুলে পড়ে । অথচ বাংলাদেশে কত নদীতীরের মাঠে, কত বাশবনের হামল ছায়ায় অযত্ন সস্তৃত অদ্ভূত ধরনের ঝোপরাজি কত যে ছড়ানে, প্রকৃতিই স্বয়ং সেখানে gardon architect—কত পুরোনো ঝোপও আছে তাদের মধ্যে—আমাদের গ্রামেই আমি এমন সব কেয়োবাকার ঝোপ দেখেচি—যা আমার বাল্য দিনগুলিতে যেমন ছিল, আজিও তেমনি আছে, কিন্তু কে তাদের মূল্য দেয় এদেশে । আদর তো করেই না, বরং গলাগলি দেয়--ওরাই নাকি ম্যালেরিয়ার স্বষ্টি করচে । আমার গ্রামে ইছামতী-তীরের মাঠে এ রকম অনেক ঝোপ আছে, শনি রবিবারের অবকাশে কতদিন এ ধরনের ঝোপে বসে মাথার ওপরকীর নিবিড় শাখাপত্রের অন্তরালবর্তী নানাজাতীয় বিহঙ্গের কল-কাকলির মধ্যে আপন মনে বই পড়ে বা লিখে সারাদুপুর কাটিয়েচি, দূরপ্রবাসে সে কথা মনে পড়ে দেশের জন্তে মন কেমন করে ওঠে। হাটতে ইটিতে, এইবার পাহাড নিকটে এল ক্রমশ । পাহাড়ের ওপরের বন সবুজের ঢেউএর মতো নীচে নেমে এসেচে। কত রকমের গাছ, প্রধানত শাল ও পড়াশী, আরও অজানা নানা গাছ । মহুয়া গাছ এ অঞ্চলে কোথাও দেখিনি। পাহাড়ের ওপরকার বন বেশ ঘন, বড় বড় পাথরের চাই পাহাড়ের পাদদেশে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়ানো, মাঝে মাঝে নেমে এসেচে পাহাড়ী ঝরন। আমরা একটা পাহাড়ে উঠলুম—কাঠ কুড়তে যায় গ্রাম্য লোকে যে সরু পথে বেয়ে, সেই পথে দুজনে অতি কষ্টে লতা ধরে ধরে উঠি—আবার হয়ত একটা শিলাখণ্ডে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করি—আবার উঠি। এ পাহাড়ের কোথাও জল নেই—দুজনেরই ভীষণ পিপাসা পেয়েচে, হেমেনের রীতিমত কষ্ট হচ্চে আমি বেশ বুঝতে পারলুম, কিন্তু কিছুই করবার নেই। তা ছাড়া বস্তি থেকে অনেকদূরে নির্জন বন-প্রদেশে এসে পড়েচি, লোকজনের মুখ দেখা যায় না, গলার স্বরও শোনা যায় না ।