পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৪৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক ৪২৩ জানেন না বলেই মনে হল। বৌদ্ধধর্ম বলে যে একটি ধর্ম ভারতবর্ষে আছে বা ছিল এসব ঐতিহাসিক তথ্য র্তার জানা থাকবার কথা নয়। কামর ছুটি ছোট বটে, কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একটা রাত্ত কাটাবার পক্ষে নিতান্ত মন্দ হবে না । সন্ন্যাসিনী বললেন—বাঙালীর ডালভাত ভালোবাসে—এখানে কিন্তু তা দিতে পারবে না। আমরা বললুম—তাতে কি। যা দেবেন, তাতেই চলবে। হেমেন চুপিচুপি আমার বললে—বিছানা কোথায়, শুকনো পাতালত পেতে শুয়ে থাকতে হবে না কি ? কিন্তু শোবার সময়ের এখনও অনেক দেরি—সে ভাবনায় এখুনি দরকার নেই। সন্ধ্যা নেমে আসায় সেই অপূর্ব মুনার উপত্যকাটিতে রাঙা রোদ সু-উচ্চ বুদ্ধ নারকেল বৃক্ষের শীর্ষদেশ স্বৰ্ণাভ করে তুলেচে-চারিদিকে স্বপ্নপুরীর মতো নিস্তব্ধ শাস্তি। - সন্ন্যাসিনীকে জিজ্ঞেস করলুম—এই উচু গাছটাকে কি বলে ? উনিই বললেন—বুদ্ধ নারিকেল। আমরা তার কাছ থেকে কিছুক্ষণের জন্তে বিদায় নিয়ে উপত্যকার পূর্বদিকে বেড়াতে গেলাম। সন্ন্যাসিনী বারণ করে দিলেন সন্ধ্যার অন্ধকার হওয়ার সময় আমরা যেন বাইরে না থাকি এবং বনের মধ্যে বেশিদূর না যাই। ভালুকের ভয় তো আছেই, তা ছাড়া বাঘও মাঝে মাঝে যে বার না হয়, এমন নয় । ঝরনা পার হয়ে খানিকদূর গিয়ে অরণ্য নিবিড়ভর হয়েচে, বড় বড় পাথরের চাই এখানে ওখানে গড়িয়ে পড়েচে পাহাড় থেকে। কত কি পাখীর কলরব গাছপালার ডালে ডালে ; আমরা বেশিদূর না গিয়ে ক্ষুদ্র পাহাড়ী নদীর ধারে একখণ্ড পাথরের ওপরে বসে রইলুম। সন্ধ্যার অন্ধকার নামবার পূর্বেই আশ্রমে ফিরে এলুম। মাতাজী আগুন করে আটার লিটি সেঁকচেন, আমাদের কাছে বসত্তে বললেন। আমাদের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলেন, ভাগলপুরে কি করি, কে কে আছে, বিবাহ করেচি কিন ইত্যাদি মেয়েলি প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমি বললুম, এ মন্দির কতদিনের মাতাজী ? —মন্দির অনেক দিনের, তবে লক্ষ্মীসরাই-এর একজন ধনী মাড়োয়ারী ব্যবসাদার মন্দির নতুন করে সারিয়ে দিয়ে ভেতরের কামরাও করে দিয়েচে । --আপনি কতদিন আছেন এখানে ? —দশ বারো বছর— —ভয় করে না একলা থাকতে ? —ভয় কিসের? পরমাত্মার কুপার কোনো বিপদ হয় নি কোনোদিন । দশ বছর আগে এই সন্ন্যাসিনী গৌরাঙ্গী তরুণী ছিলেন, সে কথা মনে হল, আর মনে হল এই নির্জন উপত্যকার মন্দির মধ্যে এক রাজিৰাপনের বিপদ সে অবস্থায়।