পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক 8ર(t আমি বললুম, ভগবানকে কখনো দেখেচেন মাতাজী ? —ন, সেভাবে দেখিনি। কিন্তু মনে মনে কতবার তাকে অনুভব করেচি। চোখের দেখার চেয়ে সে আরও বড়। চোখ ও মন দুইই তো ইন্দ্রিয়, ভগবানকে বুঝবার ইন্দ্রিয় হল মন, চোখ নয়। যদি কেউ বলে ফুলের গন্ধ দেখবো—সে দেখতে পাবে না, কারণ গন্ধ অনুভব করবার ইন্দ্রির স্বতন্ত্ৰ-চোখ নয়। এও তেমনি— —তারপর কি করলেন ? —আমার চাচাজীকে বললুম, নির্জনে থাকবে, আমার আশ্রমে নিয়ে যাও, সাধন ভজনের ব্যাঘাত হচ্চে সংসারের গোলমালে। তিনি নিয়ে আসতে চাননি প্রথমে । আমি অনাহারে রইলাম তিনদিন, মুখে কেউ এক ফোটা জল দিতে পারেনি এই তিনদিনে। তখন তিনি বাধ্য হয়ে নিয়ে এলেন। তার সঙ্গে ছিলাম পাচ বছর—তাঁর মৃত্যুর পরে একাই আছি। —ভালো লাগে এখানে একা একা ? —খুব ভালো লাগে। সংসারের গোলমাল সহ করতে পারিনে। এখানটা বড় নির্জন, মন স্থির করে থাকতে পারলে গৃহত্যাগীর পক্ষে এমন স্থান আর নেই। —কিন্তু আপনি মেয়েমানুষ, আপনার পক্ষে ভয়ও তো আছে— —সে সব ভয় কখনো করিনি। ভগবানের দয়ায় কোনো বিপদও কখনো হয়নি। সবাই মানে, আশপাশের গ্রামে আমার অনেক শিষ্য আছে, তারা প্রায়ই খোজ-খবর নেয়। সকালে দেখো এখন—তারা দুধ দিয়ে যায়, আট দিয়ে যায়, লক্ষ্মীসরাইয়ের একজন শেঠজী চাল আটা পাঠিয়ে দেয় মাসে মাসে । আমাদের রাত্রের থাবার তৈরী হল । চাঁপাটি আর ডাল মাতাজী কাছে বলে যত্ব করে খাওয়ালেন। রাত্রে শোবার বন্দোবস্তও খুব ভালো না হলেও নিতান্ত খারাপ নয় দেখলুম, একপ্রস্থ বিছানা এখানে অতিথিদের জন্য মজুত থাকে, লক্ষ্মীসরাইয়ের শেঠী তার ব্যবস্থা করেচেন, আমাদের কোনই অসুবিধে হল না। হেমেন বললে, ভাই, রাত্রে মন্দির থেকে বেরুনো হবে না, বাঘের ভয় আছে ; মাতাজীকে না হয় ভগবান রক্ষণ করে থাকেন অসহায় মেয়েমানুষ বলে, আমাদের বেল তিনি অত খাতির নাও করতে পারেন তো ? অনেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প-গুজব করলুম। বনানীবেষ্টিত উপত্যকার নৈশ সৌন্দর্য দেখবার লোভ ছিল, কিন্তু হেমেন এ বিষয়ে উৎসাহ দিলে না। মাতাজীও দেননি। তবে ঘুমের মধ্যেও আমরা আশ্রমের পার্শ্বস্থিত ঝরনার বারিপতনের শস্ব শুনেচি সারা রাত। সকালে আমরা বিদায় নিলুম। ফিরবার পথে আবার সেই বুদ্ধ নারিকেলের ছায়াস্নিগ্ধ উপত্যকার মাঝখানে দাড়িয়ে আমরা চারিদিকে চেয়ে দেখলুম। অপূর্ব দৃপ্ত বটে। শুনেছিলুম কাজরা ভ্যালিতে প্লেট পাথরের কারখানা আছে কিন্তু এখানে কোনোদিকে তাঁর চিহ্ন পাওয়া গেল না । সামনের পাহাড়টা টপকে এপারে আসতে প্রায় ৰেল মটা বাজলে ।