পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক 8○〉 এন্ধ এসে আছে গঙ্গার ধারে—সেখানে রাত্রে থাকবার জায়গা নয়, ভীষণ শীত করবে, বিশেষ করে সন্ন্যাসীর কম্বল নিলে ওঁর বড় অসুবিধে হবে রাত্রে। আসল কথা পরে বুঝেছিলাম—সন্ধ্যার পরে গঙ্গার ধার থেকে মুলতানগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত পথটি খুব নিরাপদ নয়। বেশি দূর নয় যদিও, তবু দু একটা রাহাজানি হয়ে গেছে ইতিপূর্বে। শেঠজির কাছে কিছু টাকা ছিল, তিনি একজন সঙ্গী খুজচেন । সাধুজির সামনে শেঠজি কম্বলের কথা প্রথমে বলেননি—আমায় আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন,—আপনি কম্বল নিলে সাধুঙ্গি শীতে জমে যাবেন রাত্রে। উনি বুড়ে মানুষ— নেবেন না ওঁর কম্বল। আপনি চলুন আমার সঙ্গে । একথা আমার আগে কেন মনে হয়নি ভেবে বেশ একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়লাম। তারপর দুজনে এসে নৌকোয় চড়ে তীরে নামলাম। এক দাড়িয়ে ছিল। ট্রেন আসবার অল্প সময় যখন বাকি, তখন এক্কাওয়ালা আমাদের স্টেশনে পৌছে দিল । গৈবীনাথ আর যে-দুবার গিয়েচি, তখন এমন নির্জন ছিল না স্থানটি—এবারকারের মতো আনন্দ পাইনি আর সেখানে । এই সঙ্গে আরও একটি দেবমন্দিরের কথা বলি। আমার খুব ভালো লাগতো জায়গাটি— যদিও স্থানীয় গ্রাম্য লোক ছাড়া সেখানে অন্ত লোক কখনও বায়নি। থানা বিহিপুর স্টেশন থেকে ছ-সাত মাইল দূরে পর্বতা বলে একটি গ্রাম আছে। আমাকে একবার কি কাজে সেখানে যেতে হয়েছিল—স্থানটি উত্তর-বিহারের অন্তর্গত, সুতরাং বাংলাদেশের মতো অনেকটা গুমিল প্রকৃতির। এক জায়গায় পথের ধারে এমন নিবিড় বৃক্ষরাজির সমাবেশ যে, সত্যিই বাংলাদেশে আছি বলে ভ্রম হয়। সময় ছিল দুপুরের কিছু পরে। আমি গাছতলায় একটুখানি বিশ্রাম করচি, এমন সময়ে রামশিঙা বেঙ্গে উঠলে কোনো দিকে। আমার সামনে দিয়ে দু-তিনটি গ্রাম্য লোক পেতল ও কাসার কান-উচু থালা হাতে বনের ওপারে কোথায় যাচ্চে দেখে তাদের একজনকে বললুম—কোথায় শিঙে বাজচে হে ? একজন আঙুল তুলে দেখিয়ে বললে—রামজীর মন্দিরে। নদীর ধারে—আমরা সেখানে প্রসাদ আনতে যাচ্চি—ভোগের সময় শিঙে বাজে রোজ । আমিও ওদের সঙ্গে গেলাম। নদীর স্থানীয় নাম বুঢ়ল নদী—আমাদের কাটিগঙ্গার খালের চেয়ে যদি কিছু বড় হয়। তার ধারে অতি সুন্দর স্থানে আশ্রম ও দেবমন্দিরের কারুকার্য সাধারণ গ্রাম্য স্থপতির পরিকল্পিত, এই একই গড়নের মন্দির উত্তর-পূর্ব বিহারের প্রায় অনেক গ্রামেই দেখতে পাওয়া যায়। ক্ষুদ্র মনির, কিন্তু মন্দিরসংলগ্ন জমি আছে অনেকটা। নদীর ধারে মুন্দর ফুলবাগান, সমস্ত স্থানটি ভারি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একজন বৃদ্ধ মোহান্ত মন্দিরে থাকেন, তিনি আমার প্রসাদ খেতে আহ্বান করলেন। আমি দ্বিরুক্তি না করে সম্মতি জানালাম। তিনি আমাকে আদর করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বসালেন ।