পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৭০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


888 বিভূতি-রচনাবলী জমি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এদিকের ভূমির প্রকৃতি ও উদ্ভিদ-সমাবেশ সাওতাল পরগনার মতে, তেমনি কাকরভরা, রাঙা, বন্ধুর—শুধু শাল ও মউল বনে ভরা, ঠিক যেন দেওঘর মধুপুর কি গিরিডি অঞ্চলে আছি বলে মনে হয়। বেলা প্রায় নটার সময় দূর থেকে একটা মন্দিরের চূড়ো দেখা গেল—কিন্তু চূড়োটা যেন পথের সমতলে অবস্থিত। অম্বিক বলুলে— ওই লছমীপুর। আমি জানি রাজবাড়ির কালীমন্দির খুব বড়, ওটা তারই চুড়ে । কিন্তু মন্দিরের চুড়ে পথের সমতলে কি করে থাকে, আমরা দুজনে প্রথমটা বুঝতে পারিনি—বুঝলুম যখন আমরা লছমীপুরের আরও নিকটে পৌঁছেচি। লছমীপুর একটা নিম্ন উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত, চারিদিক থেকে পথগুলো ঝরনার মতো নীচের দিকে নেমে পড়েচে উপত্যকার মধ্যে। আমাদের পথ ক্রমশ নীচে নামচে, দুপারের শাল বন আরও নিবিড় হয়ে উঠেচে, অথচ কোনো ঘরবাড়ি চোখে পড়ে না—কেবল সেই মন্দিরের চূড়োটা আরও বড় ও স্পষ্ট দেখাচ্চে। একটা জায়গায় এসে হঠাৎ নীচের দিকে চাইতেই অনেক ঘরবাড়ি একসঙ্গে চোখে পড়ল । সত্যিই ভারি মুন্দর দৃশ্য। বনজঙ্গলে ভরা একটা খুব নাবাল জায়গায় এই ক্ষুদ্র গ্রামটির ঘরবাড়ি যেন ছবির মতো সাজানো। গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা সেকেলে ধরনের পুরোনো ইটের বাড়ি ও সেই মন্দিরটা । অম্বিক বললে—ওই রাজবাড়ি নিশ্চয় । নদীয়ার্চাদবাবু স্থানীয় কোনো এক কর্মচারীর নামে একখানা পত্র দিয়েছিলেন আমাদের সম্বন্ধে, যার বলে আমরা রাজবাড়ির অতিথিশালায় স্থান পেলুম। অতিথিশালাটি বেশ বড়, খোলার ছাদওয়ালা চারপাঁচটি কামরাযুক্ত বাড়ি। দড়ির চারপাই ছাড়া ঘরগুলিতে অন্ত কোনো আসবাব নেই। এখানে একটি অদ্ভুত বেশভূষাধারী যুবককে দেখে আমরা দুজনেই কৌতুহলী হয়ে পড়লুম তার সঙ্গে আলাপ করবার জন্তে । যুবকটির বয়স ত্রিশের মধ্যে, রং মিশকালো, মাথায় লম্বা লম্বা বাবরি চুলে কেয়ারি করে টেরি কাটা, গায়ে সাদা ফুলদার আদির পাঞ্জাবি, গলায় রঙীন রুমাল বাধা—আর সকলের চেয়ে যা আমাদের চোখে বিস্ময়কর ঠেকলে, তা হচ্চে এই যে, এই দিন-দুপুরে লোকটার পকেটে একটা পাচ ব্যাটারির প্রকাও টর্চ। বাঙালী নয় যে, তা বুঝতে এতটুকু দেরি হয় না। অম্বিকা বললে—লোকটাকে কিসের মতো দেখাচ্চে বলে তো ? ঠিক যেন যাত্রীদলের বড় কে৪ঠাকুর ; মাথার চাচর চিকুর, মায় বাশিটা পর্যন্ত হুবহু—ন ? —ডেকে নাম জিজ্ঞেস কর না ? 驟 কিছু পরেই আমরা অতিথিশালার ম্যানেজারের কাছে যুবকটির পরিচয় পেলুম। সে রাজার শুলক, এখানেই সামান্ত কিছু কাজ করে রাজ-স্টেটে, বেশ আমুদে লোক—আর নাকি খুব ভালো নাচত্তে জানে।