পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৭৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক 88ማ গাছপালা আর বনঝোপ—শুধু বনস্পতির দল আকাশের দিকে মাথা তুলে দাড়িয়ে— আমাদের মাথার ওপর বনগাছের ফঁাকে র্যণকে শরভের নীল আকাশ । কোনো লোকালয় নেই, একটা লোক নেই যে তাকে জিজ্ঞেস করি পথের কথা। মনে একটা অদ্ভূত আনন্ম এল হঠাৎ কোথা থেকে। ঘরে বসে সে আনন্দ কোনোদিন কখনো পাওয়া যায় না। অম্বিকাও দেখলুম পথের নেশায় মাতাল হয়ে উঠেচে। ও বললে—চলো চোখ বুজে যে পথে হয়, না হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত বনের মধ্যে ঘুরবো, রাত হয় গাছের ওপরে উঠে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। আন্দাজ করে একটা পথ বেছে নিয়ে তাই ধরে চললাম। ক্রমশ বন নিবিড়তর হয়ে উঠেচে, আমাদের মনে হচ্ছিল যে, যে কোনো মুহূর্তে আমরা ভালুক কি বাঘের সামনে পড়তে পারি। এ বনে সে ব্যাপারটা এমন কিছু অসম্ভব নয়। অম্বিকা বললে—এসো একটা রাত বনের মধ্যেই কাটিয়ে দেওয়া যাক। আমারও নিতান্ত অনিচ্ছা ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল দুজনে সামনের দিকে এগিয়েই চলেচি, দুজনেরই বেীক বন পার হয়ে ফাক জায়গায় পড়বার দিকে। বনের মধ্যে কোনো গাছ এমন নেই যার ফল খাওয়া যায়, একমাত্র আমলকি ছাড়া। সেকালের মুনিঋষিরা শোনা যায় বনের মধ্যে কুটির নির্মাণ করে নাকি বনের ফল থেয়ে জীবনধারণ করতেন ! কথাটার মধ্যে কতদূর সত্যতা আছে জানি না। আমি অনেক স্থানের বন ঘুরে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেচি, তাতে আমার মনে হয়েচে মামুষের খাদ্যোপযোগী ফলের গাছ পার্বত্য অরণ্যে কচিৎ দেখা যায়—তাও আম, কলা, বেল, আনারস, লিচু প্রভৃতি ভালো জাতীয় ফল নয়— হয় আমলকি, কেঁদ প্রভৃতি নিকৃষ্ট শ্রেণীর ফল, বড়জোর বুনো রামকলা, বিচি বোঝাই ও মহিষের অখাদ্য । মানুষের খাদ্যোপযোগী বহুপ্রকার ফলবুক্ষের একত্র সমাবেশ মামুষের হাতে তৈরী ফলের বাগান ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না। আমি সিংড়ুম ও উড়িয়ার অরণ্যাঞ্চলে দেখেচি শুধু শাল, অৰ্জুন, বস্ত আমলকি, কেঁদ, পলাশ ও আসান গাছ ছাড়া অন্ত কোনো প্রকার গাছ মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ অরণ্যের মধ্যে কোথাও নেই—একমাত্র আমলকি ও কেঁদ ছাড়া এদের মধ্যে অন্ত কোনো গাছে মাছুষের খাওয়ার উপযুক্ত ফল ফলে না—হিমালয়ের ও আসামের আরণ্য প্রদেশেও খাদ্যোপযোগী ফলবৃক্ষ বেশি নেই। উড়িয়ার কোনো কোনো বনে বস্ত বিববৃক্ষ দেখা যায় বটে—কিন্তু তার ফলের ভেতরটা আঠা ও বিচিতে ভর্তি, স্বাদ কষ ও ঈষৎ তিক্ত, মানুষের পক্ষে অখাদ্য । বিশেষ করে আমার বলবার বিষয় এই, সাওতাল পরগণা, দক্ষিণ বিহার, সিংস্কৃম ও মধ্যপ্রদেশের আরণ্য প্রদেশ মানুষের প্রতি ভয়ানক নিষ্ঠুর—এখানে বিচিত্র বস্ত পুপ নেই, খাওয়ার উপযুক্ত বিশেষ কোনো ফল নেই। মুনি-ঋষির আর যে কোনো বনেই বাস করুন, এই সব স্থানের বনে নিশ্চয়ই বাস করতেন না–করলে অনাহারে মারা পড়তেন। অন্ত কোনো দেশের অরণ্যে প্রকৃতি মাছুষের জন্তে ফলের বাগান সাজিয়ে যদি রেখেই থাকেন— তবে তার সন্ধান আমার জানা নেই। 轉