পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৪৮৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8☾b~ বিভূতি-রচনাবলী মনের গোপন তলায় একটা প্রশ্ন বার বার উকি মারছিল—ভদ্রলোক অবিবাহিত না বিপত্নীক ? কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনাও নেই, এমন নয় তো ? —আর ছখানা পুরী নিন—ন না, লজ্জা করবেন না মশাই, লজ্জা করলে ঠকবেন রাত্রে। সেই বিলাসপুরে ভোর, তার আগে কিছুমিলবে না ভালো খাবার— খাওয়া-দাওয়া শেষ হল দুজনেরই। ভদ্রলোক নিশ্চয়ই খুব মাতৃভক্ত, তার মাতৃদেবীর গুণকীর্তন শুনতে হল অনেকক্ষণ বসে। শোবার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শয্যা আশ্রয় করতে পারলুম না। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, আমার ঠিক মনে নেই, একটা কি স্টেশনে দেখি ভদ্রলোক আমার বাকুনি দিয়ে বলচেন—৪ মশাই, উঠুন-একটু চা খান—খুব ভালো চা এই স্টেশনের—এই ধরুন কাপট উকি মেরে জানালা দিয়ে দেখি স্টেশনের নাম ঝামুগুড। বললুম, রাত কত মশাই ? —তিনটে পচিশ– ট্রেন ছাড়লে চেয়ে দেখি রেলের দুধারে শেষরাত্রের অন্ধকারে কেবল বন আর বন। মধ্যপ্রদেশে এসে পড়া গেল নাকি ? আরও অনেক স্টেশন চলে গেল। বন আর পাহাড়, পাহাড় আর বন, শেয-রাত্রের ঘন অন্ধকারে কেমন অপরূপ মনে হচ্ছে। কখনো এ লাইনে আসিনি—বনের এমন শোভা যে এ লাইনে আছে তা আমার জানা ছিল না। সেদিক থেকে বেঙ্গল নাগপুর রেলপথ একটি বিশেষ লাইন, যা কিনা চক্ষুষ্মান ও প্রকৃতিরসিক যাত্রীর সামনে আদিম ভারতের ছবি ধীরে ধীরে খুলে ধরবে, তার নিবিড় অরণ্যানী ও শৈলশ্রেণী, কোল, মুণ্ড, ওঁরাওদের বস্তির সারি, স্থানের অনার্য নাম ইত্যাদি মনে করিয়ে দেয় প্রাকৃ-আর্য যুগের ভারতবর্ষের কথা । জানালা খুলে অন্ধকারে বনশ্রেণীর দিকে চেয়ে বসে রইলুম। ঘুম আমার চোখ থেকে চলে গেল। পয়সা খরচ করে দেশ বেড়াতে এসেচি, ঘুমোবার জন্তে নয়। আমার সহযাত্রী কিছুক্ষণ বসে ছিলেন, তারপর আবার শুয়ে পড়লেন। ট্রেনের কামরার মধ্যে কোনো শৰা নেই, সবাই ঘুমুচ্চে, আমার নীরব উপভোগের বাধা জন্মায় এমন কোনো বিবাদী মুর কানে আসে না, মনে হল বহুকাল ধরে চেয়ে থাকলেও চোখ আমার কখনো প্রান্ত হয়ে উঠবে না, মন তার আনন্দকে হারাবে না। রাতের অন্ধকারে সে বিশাল বনভূমির দৃপ্ত যে না দেখেচে, সে পৃথিবীকে অত্যন্ত মহিমময় একটি রূপে আদৌ প্রত্যক্ষ করেনি, তার শিক্ষা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। বিশালের অনুভূতি মনে জাগায় এমন যে কোনো দৃষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের বক্তৃতার চেয়েও অনেক মূল্যবান জিনিস শিক্ষার দিক থেকে। আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ এখনও এ বিষয়ে উদাসীন, নতুবা ছুটিতে ছেলেদের নিয়ে দেশ বেড়াবার ব্যবস্থা করতো, পয়সা খরচ করে যদি নাও হয়, পায়ে হেঁটে যতদূর হয় তাও তো করা যেতে পারে।