পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৫১৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিযাত্রিক 8న) প্রমোদ, পরিমল ও কিরণ হেঁটে রওনা হয়ে গেল। আমি একটু পরে গোরুর গাড়িতে রওনা হলুম। বিশ্বাধর অনেকখানি রাস্ত আমার গোরুর গাড়ির পাশে পাশে এল । পথের পাশে শালবনে সেই নাচের দল রেখে খাচ্চে—শালপাড়ায় ভাত বেড়ে নিয়েচে, আর একটা অদ্ভুক্ত গড়নের কাসার বাটিতে কি তরকারি। বেশ জায়গায় বসে খাচ্চে ওরা। গ্রাম সেখানে শেষ হয়ে গিয়েচে, ডাইনে বনত্ৰেণী, পেছনের শৈলমাল জ্যোৎস্নায় কেমন অদ্ভুত দেখাচ্চে। শালমঞ্জরীর গন্ধে-ভরা সান্ধ্য-বাতাল । ইচ্ছে হয় ওদের নাচের দলে যোগ দিয়ে এই সব জংলী গায়ে ঘুরে বেড়াই। গ্রাম ছাড়িয়ে চলেচি। বিম্বাধর ও তার দল বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমার দুধারে নির্জন, শিল্পাখণ্ড-ছড়ানো প্রাস্তর, প্রান্তরের মাঝে মাঝে শালপলাশের বন । পথ কখনে নিচে নামচে কখনো ওপরে উঠচে। গাড়োয়ান নীরবে গাড়ি চালাচ্চে, দু একবার কি বলেছিল কিন্তু তার দেহাতী উড়িয়া বুলি আমি কিছুই বুঝলুম না। অগত্য সে চুপ করে আপন মনে গাড়ি চালিয়ে চলেচে। স্বতরাং এই জ্যোৎস্নালোকিত পাহাড়ে, অরণ্যে ও প্রাস্তরে আমি যেন একা। জ্যোৎস্না ফুটলে শালবনের রূপ যেন বদলে গেল, পাহাড়শ্রেণী রহস্যময় হয়ে উঠলো। অনেকদিন কলকাতা শহরে বদ্ধ জীবন-যাপনের পরে, এই রোদপোড়া মাটির ভরপুর গন্ধ আমাকে আমার উত্তর-বিহারে যাপিত অরণ্যবাসের দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দিয়ে এই রাত্রি, এই জ্যোৎস্নালোককে আরও মধুময় করে তুলেচে। দুটাে তারা উঠেচে ব্যদিকের পাহাড় শ্রেণীর মাথায়। বৃহস্পতি ও শুক্র। পার্ক সার্কাসে টুইশানি করতে যাবার সময় রোজ দেখতুম তারা দুটো বড় বড় বাড়ির মাথার উপর উঠচে। সেদিনও দেখে এসেচি। চোখ বুজে কল্পনা করবার চেষ্টা করলুম কোথায় পার্ক সার্কাসের সেই তেতালা বাড়িট, সেই ট্রাম লাইন, আর কোথায় এই মুক্ত প্রান্তর, জ্যোৎস্না-ওঠা বনভূমি, ঝরনা, বঁাশবন, পাহাড়শ্রেণী 1-কোনো দিকে কোনো শব্দ নেই। এক যেন আমি এই সৌন্দর্যলোকের অধিবাসী। মন এ সব স্থানে অন্ত রকম হয়ে যায়। প্রত্যেকের উচিত গভীর নির্জন স্থানে মাঝে মাঝে বাস করা। মন অন্তরকম কথা কয় এই সব জায়গায়। মনের গভীরতম দেশে কি কথা লুকোনো আছে, তা বুঝতে হলে নিৰ্দ্ধনতার দরকার। ভারতবর্ষের রূপও যেন ভালো করে চেনা গেল আজ। বাংলার সমতলভূমিতে বাস করে আমরা ভারতের ভূমিত্রর প্রকৃত রূপটি ধরতে পারি না। অথচ এই রাস্তা, মাটি, পাহাড় আর শালবন—এখান থেকে আরম্ভ করে সমগ্র মধ্য ভারতের এই রূপ। খড়গপুর ছড়িয়েই আরম্ভ হয়েছে রাঙা মাটি, পাহাড় আর শালবন—এই চারশে মাইল বরাবর চলেচে ; শুধু চারশে কেন, আটশে মাইল আরও চলেচে সহাদ্রির অরণ্যানী ও ঘাট-শ্রেণী পর্যন্ত। ওদিকে মহীশূর, নীলগিরি, মালাবার উপকূলে পিক্যাল অরণ্য। জার্ষাবর্তে সমতলভূমি