পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অপরাজিত २& আর বড় একটা বাহির হন না। ছেলেরা এই সময়ে এঘর-ওঘর বেড়াইয়া গল্পগুজবের অবকাশ পায়। সমীর দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া বলিল, এসো নৃপেন, এই আমার খাটে বসে-শিশির যাও ওখানে—অপূর্ব জানো তাল খেলা ? নৃপেন বলিল, হেডমাস্টার আসবে না ভো ? শিশির বলিল, হ্যা, এত্ত রাত্তিরে আবার হেডমাস্টার— অপূর্বও তাস খেলিতে বসিল বটে কিন্তু শীঘ্রই বুঝিতে পারিল, মায়ের ও দিদির সঙ্গে কত কাল আগে খেলার সে বিদ্যা লইয়া এখানে তাসখেলা খাটিবে না । তাসখেলায় ইহারা সব ঘূর্ণ, কোন হাতে কি তাস আছে সব ইহাদের নখদর্পণে। তাহ ছাড়া এতগুলি অপরিচিত ছেলের সম্মুখে তাহাকে তাহার পুরাতন মুখচোরা রোগে পাইরা বসিল ; অনেক লোকের সামনে সে মোটেই স্বচ্ছন্দে কথাবার্তা বলিতে পারে না। মনে হয়, কথা বলিলেই হয়ত ইহার হাসিয়া উঠিবে। সে সমীরকে বলিল, তোমরা খেলো, আমি দেখি। শিশির ছাড়ে না। বলিল, তিনদিনে শিখিয়ে দেব, ধরে দিকি তাস। বাহিরে যেন কিসের শব হইল। শিশির সঙ্গে সঙ্গে চুপ করিয়া গেল এবং হাতের তাস লুকাইয়া পরের পাঁচ মিনিট এমন অবস্থায় রহিল যে সেখানে একটা কাঠের পুতুল থাকিলে সেটাও তাহার অপেক্ষ বেশী নড়িত। সকলেরই সেই অবস্থা । সমীর টেবিলের আলোট একটু কমাইয়া দিল। আর কোন শব্দ পাওয়া গেল না। নৃপেন একবার দরজার ফাক দিয়া বাহিরের বারান্দীতে উকি মারিয়া দেখিয়া আসিয়া নিজের ভাল সমীরের তোশকের তলা হইতে বাহির করিয়া বলিল, ও কিছু না, এস এস-তোমার হাতের খেলা শিশির। রাত এগারোটার সময় পা টিপিয়া টিপিয়া যে যাহার ঘরে চলিয়া গেলে অপূর্ব জিজ্ঞাসা করিল, তোমাদের রোজ এমনি হয় নাকি ? কেউ টের পায় না? আচ্ছ, চুপ ক’রে বসেছিল, ও ছেলেটা কে ? ছেলেটাকে তাহার ভাল লাগিয়াছে। ঘরে ঢুকিবার পর হইতে সে বেশী কথা বলে নাই, তাহার খাটের কোণটিতে নীরবে বসিয়া ছিল। বয়স তেরোচোঁদ হইবে, বেশ চেহারা। ইহাদের দলে থাকিয়াও সে এতদিনে তাসখেলা শেখে নাই, ইহাদের কথাবার্তা হইতে অপূর্ব বুঝিয়াছিল। পরদিন শনিবার। বোর্ডিং-এর বেশীর ভাগ ছেলেই সুপারিন্টেগুেন্টের কাছে ছুটি লইয়া বাড়ি চলিয়া গেল। অপূর্ব মোটে দুই দিন হইল আসিয়াছে ; তাহা ছাড়া যাতায়াতে খরচপত্রও আছে, কাজেই তাহার যাওয়ার কথাই উঠিতে পারে না। কিন্তু তবু তাহার মনে হইল, এই শনিবারে একবার মাকে দেখিয়া আসিলে মন হইত না,—লারা শনিবারের বৈকালট কেমন খালি-খালি ফকা-ফাকা ঠেকিতেছিল। সন্ধ্যার সময় সে ঘরে আসিয়া আলো জালিল। ঘরে সে একা, সমীর বাড়ি চলিয়া গিয়াছে, এ রকম চুণকাম-করা ঘরে একা থাকিবার সৌভাগ্য কখনও তাহার হয় নাই, সে