পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/৭০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88 বিভূতি-রচনাবলী । ছিল নির্মল, বাতাস কি শাস্ত, নবীন উৎসাহ ভরা মধুচ্ছনা! মধুর নিশ্চিন্দিপুর! মধুর ইছামতীর কলমর্মর "মধুর তাহার দুঃখী দিদি দুর্গার স্নেহভরা ডাগর চোখের স্থতি P.কতদূর, ক—ত দুর চলিয়া গিয়াছে সে দিনের জীবন। খেলাঘরের দোকানে নোনা-পাতার পান বিক্রী, সেই সতুদার মাকাল ফল চুরি করিয়া দৌড় দেওয়৷ ” একবার একখানা বইতে সে পড়িয়ছিল দেবতার মায়ায় একটা লোক স্নানের সময় জলে ডুব দিয়া পুনরায় উঠবার যে সামান্ত ফাকটুকু তাঁহারই মধ্যে ষাট বৎসরের মুদীর্ঘ জীবনের সকল মুখ দুঃখ ভোগ করিয়াছিল—যেন তাহার বিবাহ হইল, ছেলেমেয়ে হইল, তাহারা সব মানুষ হইল, কতক বা মরিয়া গেল, বাকীগুলির বিবাহ হইল, নিজেও সে বুদ্ধ হইয়া গেলহঠাৎ জল হইতে মাথা তুলিয়া দেখে—কোথাও কিছু নয়, সে যেখানে সেখানেই আছে, কোথায় বা ঘরবাড়ি, কোথায় বা ছেলেমেয়ে !... গল্পট পড়িয়া পর্যন্ত মাঝে মাঝে সে ভাবে তাহারও ওরকম হয় না ? এক-এক সময় তাহার মনে হয় হয়ত বা তাহার হইয়াছে। এ সব কিছু না—স্বপ্ন। বাবার মৃত্যু, এই বিদেশে, এই স্কুলে পড়া—সব স্বপ্ন। কবে একদিন ঘুম ভাণ্ডিয়া উঠিয়া দেখিবে সে নিশ্চিন্দিপুরের বাড়িতে তাহদের সেই বনের ধারের ঘরটাতে আষাঢ়ের পড়ন্ত বেলায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল—সন্ধার দিকে পাখির কলরবে জাগিয়া উঠিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে ভাবিতেছে, কি সব হিজিবিজি অর্থহীন স্বপ্নই না সে দেখিয়াছে ঘুমের ঘোরে ...বেশ মজা হয়, আবার তাহার দিদি ফিরিয়া আসে, তাহার বাবা, তাহীদের বাড়িটা। একদিন ক্লাসে সত্যেনবাবু একটা ইংরেজি কবিতা পড়াইতেছিলেন, নামটা গ্রেভস্ অফ এ হাউসহোল্ড। নির্জনে বসিয়া সেটা আবৃত্তি করিতে করিতে তাহার চোখ দিয়া জল পড়ে। ভাইবোনেরা একসঙ্গে মানুষ, এক মায়ের কোলেপিঠে, এক ছেড়া কঁথার তলে। বড় হইয়া জীবনের ডাকে কে কোথায় গেল চলিয়া—কাহারও সমাধি সমুদ্রে, কাহারও কোন অজানা দেশের অপরিচিত আকাশের তলে, কাহারও বা ফুল-ফোটা কোন গ্রাম্য বনের ধীরে । আপনা-আপনি পথ চলিতে চলিতে এই সব স্বপ্নে সে বিভোর হইয়া যায়। কত কথা যেন মনে ওঠে। যত লোকের দুঃখের দুর্দশার কাহিনী। নিশ্চিন্দিপুরের জানালার ধারে বসিয়া বাল্যের সে ছবি দেখা—সেই বিপন্ন কর্ণ, নির্বাসিত সীতা, দরিদ্র বালক অশ্বখাম, পরাজিত রাজা দুর্যোধন, পল্লীবালিকা জোয়ান। বুঝাইয়া বলিবার বয়স তাহার এখনও হয় নাই ; ভাবকে সে ভাষা দিতে জানে না—অল্পদিনের জীবনে অধীত সমুদয় পদ্য ও কাহিনী অবলম্বন করিয়া সে যেভাবে জগৎকে গড়িয়া তুলিয়াছে—অনাবিল তরুণ মনের তাহা প্রথম কাব্য—তার কাচা জীবনে মুখে দুঃখে, আশায় নিরাশায় গাথা বনফুলের হার –প্রথম উচ্চারিত ঋকুমন্ত্রের কারণ ছিল যে বিস্ময় যে আনন্দ—তাহাদেরই সগোত্র, তাহীদেরই মত ঋদ্ধিশীল ও অবাচ্য সৌন্দর্যমন্ত্ৰ । 尊 রাগরক্ত সন্ধ্যার আকাশে সত্যের প্রথম শুকতারা।