পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অন্তরের গভীর প্রদেশে। প্রকৃতি তার মনে সাড়া জাগায় যেমন পৃথিবীর বুকে সাড়া জাগায় প্রতিটি ঋতু। এ সাড়া কেন জাগে সে জিজ্ঞাসা তার মনে নেই। প্রকৃতির সঙ্গে তার মনের যে নিগুঢ় যোগ আছে, তারই জন্য প্রকৃতির সৌন্দর্য তার মনে গানের ঝঙ্কার তোলে। এদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-চেতনার সঙ্গে বিভূতিবাবুর প্রকৃতি-চেতনার মিল আছে। উপরন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণের পিছনে একটা বিশেষ বৈজ্ঞানিক চেতনা আছে, যা বিভূতিবাবুর নেই ) বিবর্তন ও স্বষ্টির সমস্ত ধাপের ছবিটা রবীন্দ্রনাথের মনে গাথা হয়ে আছে। এই চেতনা ও এর বিস্ময় থেকে রবীন্দ্রনাথের মুক্তি নেই। তার অধিকাংশ গান বা কাব্যের কেন্দ্রে এই চেতনা প্রচ্ছন্ন থেকে ক্রিয়া প্রকাশ করে, বাইরে অনেক সময় সহজে ধরা না পড়লেও ত থাকে । এর ফলে রবীন্দ্রনাথ যে এককালে অর্থাৎ পৃথিবীর স্বষ্টির কালে, এরই অণুপরমাণুর সঙ্গে, অণুপরমাণু রূপে, এক হয়ে মিলিয়ে ছিলেন, এই বোধ থেকে প্রকৃতির তিনি আত্মীয় । এবং তার অনেকখানি এ থেকেই এসেছে। বিভূতিবাবুর ক্ষেত্রে প্রকৃতি পরম স্রষ্টার সঙ্গে commune করার একটি উপায়। এবং প্রকৃতির মধ্যেই তার ঈশ্বর প্রকাশিত এবং এই বোধ থেকেই তার আনন্দ । কিন্তু উপভোগের দিক থেকে বিভূতিবাবুর সেজন্য যে কিছু অভাব ঘটেছে তা নয়। বরং ডুিতিবাবুর ভাষা রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক বেশি আবেগময়। রবীন্দ্রনাথের উগ্র আনন্দ, পরম বিস্ময়, গ্রকৃতির প্রতি নাড়ির টানের চেতনা, এবং এর জন্য অনেক সময়েই প্রকৃতিকে তিনি humanize করে তাদের আত্মার সঙ্গে একাত্মকতা অমুভব করেছেন। ( Pathetic fallacy-র সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই কিছু ) রবীন্দ্রনাথের এই বিস্ময় বা আনন্দ যত উগ্রই হোক তা ভাষার বন্ধনে বাধ, এবং তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কারণেই। কিন্তু বিভূতিবাবুর আনন্দ যে উার কনফেশন ! এতে মাত্রা ঠিক রাখার প্রশ্নই ওঠে না। সবটাই যে সরল গ্রাণের স্বীকারোক্তি । অর্থাৎ আমি আনন্দ পেয়েছি, সে কথা তোমরা সবাই শোন। আমার সঙ্গে এসো, দেখ, উপভোগ কর । কিন্তু কে বা দেখে, কে বা শোনে ! এ দুঃখও তিনি একাধিকবার প্রকাশ করেছেন। তাই রবীন্দ্ৰকবোর সঙ্গে বিভূতিবাবুর কনফেশনের তুলনা করে লাভ নেই। - তুলনা করব না, কারণ বিশ্ব বা বিশ্বপ্রকৃতিজাত যে বিস্ময় তা দুজনেরই এক। অন্তত পৃথক নয়। শুধু দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রকাশের যেটুকু পার্থক্য। রবীন্দ্রনাথ যখন গেয়ে ওঠেন— “দেওয়া নেওয়৷ ফিরিয়ে দেওয়া তোমায় অামায় জনম জনম এই চলেছে, মরণ কভু তারে থামায় f" তখন তিনি বিশ্বের সঙ্গে স্রষ্টার সঙ্গে এবং পৃথিবীর সঙ্গে দেওয়া-নেওয়া রূপ চির দান ও গ্রহণের এবং দান নিয়ে আবার তা ফিরিয়ে দেওয়ার—একটি চিরদিনের চক্রকেই উপলব্ধি করেন । যে ঈশ্বরকে সম্বোধন করে এ গান, সে ঈশ্বর এই যুক্তিপূর্ণ সম্পর্কের সার্থকতার জন্য কবি বা শিল্পীর অনিবার্য স্বষ্টি । রবীন্দ্রনাথের এই কল্পনার মূলে আছে বিবর্তনের বিস্ময়। প্রকৃতির অনেক