পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/৩১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


হেডপণ্ডিত বৃদ্ধ লোক, স্মৃতিভ্রংশ ঘটায় অনেক সময় অনেকের নাম মনে করিতে পারেন না, বলিলেন ; আর ভাল ওই মেমসাহেব—কী ওর যেন নামটা ? —মিস সিবসন। —হঁ্যা, ও খুব ভাল মাস্টাররা বিভিন্ন দিকে ছড়াইয়া পড়িলেন। ক্ষেত্রবাবু, যদুবাবু, নারাণবাবু ও ফণীবাবু প্রতিদিন ছুটির পরে নিকটবৰ্ত্তী ছোট চায়ের দোকানে চা খাইতেন । বহুদিনের যাতায়াতের ফলে পিটার লেনের মোড়ের এই চায়ের দোকানটির সঙ্গে তাহাদের অনেকের স্মৃতি জড়াইয়। গিয়াছে। নিকট দিয়া যাইবার সময় কেমন যেন মায়া হয় । ক্ষেত্রবাবুর মনে পড়ে তাহার চার বছরের ছেলেটির কথা। সেবার একুশ দিন ভুগিয়৷ টাইফয়েড রোগে মারা গেল। কত কষ্টভোগ, কত চোখের জল ফেলা, কত বিনিদ্র রজনী যাপন ! এই চায়ের দোকানে বসিয়া সহকর্মীদের সঙ্গে কত পরামর্শ করিয়াছেন, আজ পেট ফঁাপিল, কী করিতে হইবে ; আজ কথা আড়ষ্ট হইয়া আসিতেছে, কী করিলে ভাল হয় ! এই চায়ের দোকানের সামনে আসিলেই খোকার শেষের দিনগুলি চোখের সামনে ভাসিয়া উঠে। নারাণবাবুর স্মৃতি স্কুলের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। আগের হেডমাস্টার ছিলেন অল্পকৃলবাৰু। তিনি ছিলেন ঋষিকল্প পুরুষ। দুজনে মিলিয়া এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন—খুব বন্ধুত্ব ছিল দুজনের মধ্যে। অনুকূলবাবুর অন্তরোধে নারাণ চাটুজ্জে রেলের চাকরি ছাড়িয়া আসিয়া এই স্কুলে শিক্ষাব্রত গ্রহণ করেন। এই স্কুলকে কলিকাতার মধ্যে একটি নামজাদা স্কুল করিয়া তুলিতে হইবে, এই ছিল সঙ্কল্প। একদিন-দুইদিন নয়, দীর্ঘ পনেরো ষোলো বৎসর ধরিয়া সে কত পরামর্শ, কত আশা-নিরাশার দোলা, কত অর্থনাশের উদ্বেগ ! একবার এমন সুদিনের উদয় হইল যে, নারাণবাবুদের স্কুল কলিকাতার মধ্যে প্রথম শ্রেণীর স্কুল হইয়া গেল বুঝি। হেয়ার-হিন্দুকে ডিঙাইয়া সেবার এই স্কুলের এক ছাত্র ইউনিভার্সিটিতে প্রথম স্থান অধিকার করিল। নারাণবাৰু দেড় শত টাকা বেতনে স্বপারিন্টেণ্ডেণ্ট নিযুক্ত হইবেন, সব ঠিকঠাক— এমন সময় অহুকুলবাবু মারা গেলেন। সব আশা-ভরসা কুরাইল। একরাশ দেন ছিল স্কুলের, পাওনাদারেরা নালিশ করিল। গবর্নমেন্ট-নিযুক্ত অডিটার আসিয়া রিপোর্ট করিল, স্কুলের রিজার্ড ফণ্ডের টাকা ভূতপূৰ্ব্ব হেডমাস্টার তছরূপ করিয়াছেন। বাড়ীওয়ালা ভাড়ার দায়ে আসবাবপত্র বেচিয়া লইল । নতুন ছাত্র ভর্তি হইবার আশা থাকিলে হয়তো এতটা ঘটিত না ; কিন্তু ছাত্র আসিত অমুকুলক্লাবুর নামে, তিনিই চলিয়া গেলেন, স্কুলে আর রহিল কে ? জানুয়ারি মাসে আশাকুরূপ ছাত্রের আমদানি হইল না, কাজেই পাওনাদারদের উপায়াস্তর ছিল না। হেডপণ্ডিত চা খান না, তবু মাস্টারদের সঙ্গে দোকানে বসিয়া গল্পগুজব করিয়া চা-পানের তৃপ্তি উপভোগ করেন আজ বৎ বৎসর হষ্টতে। বলিলেন, চলুন নারাণবাবু, চা খাবেন না ? আন্ধন যন্ধুবাবু, ক্ষেত্রবাবু বি. র. ৭–২