পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/৪৩৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


হে অরণ্য কথা কও 8२४ অদ্ভূত রূপ। নদীর মধ্যে ক্ষুদ্র যে একটি জলপ্রপাতের স্বষ্টি হয়েচে, সেই জলটি অনবরত পড়ে পড়ে এক ক্ষুদ্র সরোবরের মত হয়েচে••••••ওপারের বিরাট বনস্পতিশ্রেণীর ছায়া এখনও তার ওপর থেকে অপসারিত হয় নি—যদিও চাঁদ মাথার ওপরে, জলপ্রপাতের জলধারা চাদের আলোয় চকু চক্‌ করচে, শিকররাশি গভীর শীতের রাত্রের ঠাণ্ডায় জমে ধোয়ার মত উড়চে— ওর পাষাণময় তটে বসে মনে হোল, বনের মাথায় ওই যে দু’চারটি নক্ষত্র দেখা যায়, ওই নক্ষত্ৰলোক থেকে অপরিচিত রূপসী দেববালাগণ অদুখ্য চরণে নেমে আসেন এমনি জ্যোৎস্নাশুভ্র নিশীথ রাত্রে ওই গভীর অরণ্যানৗ-মধ্যস্থ সরোবরে জলকেলি করতে ইতর চক্ষুর অন্তরালে। মহাকাল এখানে আচঞ্চল, স্তব্ধ, মৌন বনস্পতিশ্রেণীর মত ধ্যান-সমাহিত । এই আকাশ, এই নির্জন জ্যোৎস্না, এই নিশীথ রাজি, এই গভীর অরণ্য যেন কি কথা বলচে– সে শব্দহীন বাণী ওই বন্য নদীর চঞ্চল কলগীতিতে মুখর হয়ে উঠচে প্রতি ক্ষণে—কিংবা গভীর অরণ্য নি:শব্দতার স্বরে স্বর মিলিয়ে অন্তরাত্মার কানে তার স্বগোপন বাণীটি পৌছে দিচ্চে। চুপ করে বসে জলের ধারে আকাশের দিকে চেয়ে, চাদের দিকে চেয়ে, বনস্পতিশ্রেণীর মধ্যে জ্যোৎস্নালোকিত শীর্ষদেশের দিকে চেয়ে সে বাণীর জন্য চোখ বুজে অপেক্ষা করো—শুনতে পাবে। সে বাণী নৈঃশব্যের বটে, কিন্তু অমরতার বার্তা বহন করে আনচে । এই অরণ্যই ভারতের আসল রূপ, সভ্যতার জন্ম হয়েচে এই আরণ্য-শাস্তির মধ্যে, বেদ, আরণ্যক, উপনিষদ জন্ম নিয়েচে এখানে—এই সমাহিত স্তব্ধতায়—নগরীর কলকোলাহলের মধ্যে নয়। আজ এখানে এলে মনে হচ্চে, অশোকের সময়েও এই কোইনা নদী ঠিক এমনি বয়ে চলতে এই গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে—এই অরণ্য আরও গভীরতর ছিল—তারও পূৰ্ব্বে আৰ্য্যদের ভারতবর্ষ প্রবেশের দিনও এই নদী এখানে এমনি চঞ্চল কলোচ্ছ্বাসে নৃত্যশীলা বালিকার নূপুরবাজানো পা-দুটির মত নৃত্যভঙ্গীতে ছুটে চলতে, উদাসীন প্রকৃতি এমনি সাজিয়েছিল এ বনভূমিকে কিন্তু কেউ কখনো দেখুক না দেখুক—প্রশ্নও করেনি। আজ আমরা এসেচি, করুণাময় বিশ্বশিল্পী যেন প্রসন্ননেত্রে হাসিমুখে নীরবতার মধ্যে দিয়ে ওই জলকলতানের মধ্যে দিয়ে বলচেন—কেউ দেখে না, কত যুগ-যুগাস্তর থেকে এমনি সাজিয়ে দিই—প্রতি দিনে, সন্ধ্যায়, প্রতি রজনীতে—আজি এলে তোমরা এতদিনে ? বড় আনন্দ হচ্চে আমার। দেখ, ভাল করে দেখ । জয় হোক তার, জয় হোক সে মহাদেবতার ! তারপর শামোর সঙ্গে কথাবার্তা বলি। ওর ভাই কামে কেমন আছে ? সত্তর বছরের বৃদ্ধ, এই করমপদ নামক বন্য গ্রামেই তার জন্ম, আর কোথাও যায়নি—যাবেও না। পঞ্চাশ বছর আগে একবার চাইবাসা গিয়েছিল—রেলগাড়ী জীবনে কখনো চড়েনি। তাকে আমরা মোটরে জাতিসিয়াং পৰ্য্যন্ত নিয়ে এলুম। তারপর সেই নিবিড় অরণ্যের শিশিরসিক্ত গাছপালায় গভীর রাত্রের জ্যোৎস্নালোক পড়েচে–সে কি চমৎকার রূপ। মোটরে ফিরবার সময় চেয়ে দেখি কত গাছ, কত পাথর, কত নিবিড় বনঝোপ—আমার ঠাকুরদা সেদিন ছেলেমানুষ ছিলেন—এসব বনে তখনও ঠিক