পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/৪৫৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88३ বিভূতি-রচনাবলী ধরে। এদের শেয়ার হোলডারদের মধ্যে পাৰ্লিয়ামেন্টের মেম্বার পর্য্যন্ত আছে। একটা খুব বড় চালাঘরে এদের ফরেস্ট ম্যানেজার মিঃ লক্নার থাকে। কেরানীদের থাকবার জন্য একটা ধাওড়া ঘর আছে। দু-একজন বাঙালী মেয়েকে যেন দেখলাম, তবে ঠিক বলতে পারি না । তারপর মাইল খানেক এগিয়ে এসে আমরা উসুরিয়া বলে একটা জায়গায়, মিঃ সিনহা যে ঘরে থাকতেন ১৯২৫ সালে, তাই দেখতে গিয়ে দেখি সেখানে বসবাস নেই। কিন্তু অপূৰ্ব্ব স্বন্দর স্থান। উক্ষরিয়া বলে একটি পাহাড়ী নদী বয়ে যাচ্ছে খুব শব্দ করে, বেশ চওড়া নদী—অসংখ্য পাথর ছড়ানো। একদিকে কি মুন্দর বনের বড় বড় গাছ ও পাষাণময় উচ্চ তীর । অপরাঞ্জের ছায়া পড়ে এসেচে, রোদ হলদে হয়েচে—পানিতরের তেতলা বাড়ীর ছোট্ট ঘরটা যেন এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। অনেকক্ষণ নদীর ধারে বসে রইলুম, কুলুকুলু শব্দ যেন এই বনত্রর অনন্ত সঙ্গীত । যেদিন ভারতে প্রথম বেদগাথার উদাত্ত স্বর ধ্বনিত হয় উস্থরিয়া ঝর্ণা তখন বহু, বহু প্রাচীন। বেদপারগ ও রচয়িত ঋষিদের অতি অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহের শৈশবেও এ এমনি বয়ে চলতে ঘনতর বনানীর মধ্যে আপনাতে আপনি মত্ত, চপল খুশিতে ভরা বন্য মেয়ের মত প্রাণোচ্ছল নৃত্যচ্ছন্দে ছুটে ছুটে, আজকার দিনের মত তখনও তার দুধারে ফুটতো দেবকাঞ্চনের ফুল, বন্য শেফালী, পাষাণের তটে কত শরৎ ও হেমন্ত সকালে ঝরা ফুলের রাশি ছড়িয়ে দিত আজও যেমন দেয়, কত চাদ উঠেচে, কত পার্থী গেয়েচে ওর দুধারের শৈলারণ্যে । সে কি প্রাণ-মাতানো কুহুকুহু ধ্বনি, বাদিকের বঁাকে বড় বড় গাছের মাথায় কম্প্রিটাম ডিকেনড্রাম লতার কচি পাতায় হলদে রোদ মাখা সে কি সৌন্দর্য্য, কি শান্তি, কি নিস্তব্ধতা—কাদা নেই, ধুলো নেই—শুধু পাষাণময় তীর, উপলবিছানো নদীগর্ভ। এইসব স্থানে প্রাচীন দিনে তপোবন ছিল, নইলে আর কোথায় থাকবে ? এরই কাছে ঘন বনের মধ্যে বনবিভাগের সংরক্ষিত অঞ্চলে (preservation plot ) ১৮৪২•• বছরের পুরনো শালগাছ দেখলুম। আমার ঠাকুরদাদা যখন বালক, তার আগে থেকেও এ গাছ এখানে রয়েচে—তবে তখন ছিল চারা মাত্র। বনস্পতিদের যারা দেখেনি, তার উপনিষদের ঋষিদের মন্ত্র যে ওষধিযু, যে বনস্পতিযু একথার মৰ্ম্ম বুঝবে না। সন্ধ্যার আগে আমরা অপূৰ্ব্ব স্বন্দর বনপথে ছোটনাগর এলুম। সামনে গুয়ায় উচু পাহাড়, আগে ভেবেছিলুম সলাইয়ের চিড়িয়া খনির। রাঙা পাথর বার করা জায়গাটা যেমন মনোহরপুর বাংলোর পাহাড় থেকে দেখা যায় তেমনি । স্বন্দর জায়গাটি—স্টেশন থেকে কুড়ি বাইশ মাইল দূরে চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা বনে ঘেরা স্থানটি—তবে একটা বন্য গ্রাম আছে, তারা বাজরা সরগুজা ইত্যাদি বুনেচে ক্ষেতে। পোংগা থেকে ছোটানাগরার এই রাস্তাটির অত্যন্ত সুন্দর দৃত, একদিকে বড় বড় পাথর ও নির্জন ঘন বনের মধ্যে দিয়ে পদে পদে সৌন্দৰ্য্যভূমি স্বষ্টি করতে করতে ছুটে চলেচে উহুরিয়া নদীটি—বাদিকে ঘন বন, কম্প্রিটাম্ ডিকেনড্রামের .মোটা মোট লতা গাছের মাথায় ঠেলে উঠে এদিকে ওদিকে নিরালম্ব অবস্থায় শূন্তে দুলছে, যেমন উম্বরিয়া নদীর দুধারে উচু মাওলালমান বনস্পতিদের মাথায় এমনি লতা দুলছিল, সাদা সাদা কচি পাতার লঙ্কার নিয়ে, যেন লাঙ্গ ফুল ফুটেচে ঝোপের মাথায় । রোদ