পাতা:বিভূতি রচনাবলী (সপ্তম খণ্ড).djvu/৫১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8፭õ বিভূতি-রচনাবলী দিচ্ছিল । জিজ্ঞেস করে জানা গেল মেয়েটি মিশনারী স্কুলে দিনকতক পড়েছিল, স্বতরাং শাড়ীব্লাউজ পরে। সামান্ত একটু ইংরিজীও জানে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ হো ও মুণ্ড জাতীয় লোক খৃষ্টান ধৰ্ম্ম অবলম্বন করেচে, অনেকে রাচি মিশনারী স্কুলের ফেরৎ । আংকুয়া বাংলো থেকে যেন উঠতে ইচ্ছে করছিল না। এমন চমৎকার কানন-ভূমিতে এমন বাংলোতে বাস করা একটি বিশেষ সৌভাগ্য। তবে অরণ্যকে ভাল না বাসলে কেউ এখানে বাস করতে পারবে না । বাংলোর চৌকিদারকে বল্লাম—রাত্রে এখানে বাঘ আসে ? —রোজই হুজুর । —হাতী ? —ওভি । ভালুক ভি বহুৎ আসে । —তোমরা থাকে] কি করে ? —র্কড়ি নিয়ে বসে থাকি ছজুর । আগুন করি । এই তো অবস্থা। যত বড় প্রকৃতির রসিকই হোক না কেন, এ নির্জন অরণ্যভূমিতে কিছু দিন বাস করতে হোলে নিছক প্রকৃতিরসিকতা ছাড়াও আর কিছু থাকা দরকার । সেটা হোল নিৰ্ভীকতা, নির্জনবাসের শক্তি, নিত্য নূতন বিলাসের লোভ-সম্বরণ । জীবন হবে এখানে সব রকম উপকরণের বাহুল্য-বজ্জিত, austere, অন্তমুখী । তবে এখানে আনন্দ, নতুবা একদিনের মধ্যে পালাই পালাই ডাক ছাড়তে হবে । ফিরবার পথে চিড়িয়া থেকে ট্রেন পেলাম না । খনির লোকেরা আমাদের জন্যে ট্রলি করে দিলেন, চোদ-পনেরো মাইল পথ বিকেলের ঘন ছায়ায় দুধারের বনভূমির মধ্যে দিয়ে ট্রলি করে আসার সে কি আনন্দ ! এই আসার পথে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল যা ভুলবার নয়। সারাপথ বাতাসে যেন গাজিপুরের দামী আতরের গন্ধ ভুরভূর করচে। বাড়িয়ে এতটুকু বলচি না । ট্রলির একজন কুলীকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কি কানে আতরমাখা তুলে গু জেছে ? সে তো অবাক । রাসবিহারীবাবুকে বল্লাম, তিনি কোন তেল মেখেচেন ? রাসবিহারীবাবু বল্লেন, গন্ধটা তেল বা আতরের নয়, নানা বনকুসুমের সম্মিলিত সুবাস । —কি ফুলের ? ট্রলি থামিয়ে থামিয়ে আমরা রেল লাইনের কাছাকাছি যত রকমের ফুল ফুটেছিল, সব তুলিয়ে আনিয়ে দেখলাম। ও-সব কোন ফুলেরই স্ববাস নয়। দেবকাঞ্চন গন্ধহীন, বস্ত শণের ফুল গন্ধহীন, আর্কিডের দু-একটা ফুল, যা চোখে পড়লে, গন্ধহীন । তবে কোন ফুলের গন্ধ ? শালের ফুল এখন ফোটে না । কুরচি ফুলও তাই । অথচ গোটা চোদটি মাইল পথ সে স্ববাসে আমোদ করতে লাগলে । ঘন, মিষ্ট, তীব্র সুবাস । রাসবিহারীবাবু এর কোনো সন্ধুত্তর দিতে পারলেন না। বন ছেড়ে আমাদের ট্রলি যখন মুক্ত প্রান্তরে বের হোল, তখন দূর দিগন্তে বোনাইগড় রাজ্যের শৈলশ্রেণীর পেছনে সূৰ্য্য অস্ত যাচ্ছে ।