এতদিন যে সকল লোকের সঙ্গে একত্র বাস করিতেছিলাম, তাঁহারা সবাই বিদায় নিলেন; বিদায় লইবার কালে কতই কষ্ট হয়। অন্য কোনও কাজ নাই, এমন অবস্থায়, সুখে, এতদিন ধরিয়া, একত্র যাহাদের সঙ্গে কত অন্তরের কথা কহিয়া অহরহঃ আনন্দ করিয়াছি, তাহাদের সঙ্গ ছাড়িতে হইল—আর হর ত ইহজীবনেও দেখা হবে না। বিদায় লইবার সময় পরস্পরের ঠিকানা ও কার্ড পরিবর্ত্তন করা হয়। তখন মনে হয় ইহাদের সহিত বরাবর চিঠিপত্র লেখা সম্বন্ধ রাখিব। পরে কর্ম্মক্ষেত্রের দারুণ নিষ্পেষণে কিছুই আর মনে থাকে না।
“ডরোথী” নাম্নী একটি দ্বাদশ বর্ষীয়া বালিকা তার মা ও বাবার সঙ্গে বাড়ী ফিরিয়া যাইতেছিল। তাহারা ইয়র্কসায়ারের অধিবাসী। সঙ্গে দুটী ছোট বোন ছিল। সবাই যেন এক একটি মোমের পুঁতুল। জাহাজে ছেলেরা ছোট ফ্রক প’রে থাকে ও শুধু পায়ে, শুধু মাথায় হেসে হেসে চারিদিকে দৌড়াদৌড়ী খেলা করিয়া বেড়ায়। তাতে যে তাদের কি সুন্দর দেখায় তা না দেখিলে বুঝান যায় না। আর ইউরোপের ও অন্যান্য সভ্যদেশের সকল স্থানেই মেয়েদের বড় আদর। আমাদের দেশেই কেবল তাহা নাই। তাই অত যত্নে ও আদরে লালিত পালিত হইয়া সে দেশের ছেলে মেয়েগুলি যেমন সুস্থ, সবল, তেমনি মিষ্টভাষী ও সুসভ্য। জাহাজে থাকিতে ডরোথী প্রায়ই আমার কাছে আসিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া গল্প করিত। তার নিজের কথা, তার ঘরের কথা, তার বাপ-মার কথা,—আর বয়স বার বছর হইলেও যেন শিশুর মত তার সরল ভাব; আসিবার সময় সে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া জমি অবধি নামাইয়া দিয়া জাহাজে ফিরিয়া গেল।
এই সকল স্থানে ‘কাষ্টম্সে’র ব্যাপার বড়ই কড়াকড়ি। পাছে কেহ লুকাইয়া কোনও পণ্যদ্রব্য লইয়া গিয়া ফরাসী সরকারের শুল্ক ফাঁকী দেয়, এই আশঙ্কায় সকলেরই সিন্দুক তোরঙ্গ খুলিয়া পরীক্ষা করা হয়।