পাতা:বিশ্বকোষ ঊনবিংশ খণ্ড.djvu/২৯২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


[ ২৯২ ] লুসাইপর্বতমালা লুসাইপর্বতমালা বিভাগের পূর্বদিকে ব্রহ্মরাজ্যের অন্তর্গত একটা সুবিস্তৃত পৰ্ব্বতময় ভূখণ্ড । উহার মধ্যস্থলে কোন কোন জাতির বাস আছে, তাহা আজিও জানা যায় নাই। কোন ভ্রমণকারী সেই বনমালাপূর্ণ ও বহু জন্তুসন্ধুল পাৰ্ব্বত্যপথে অগ্রসর হইয়া দুৰ্দ্ধৰ্ষ পাৰ্ব্বতীয়গণের সহিত মিশিতে সাহসী হন নাই । ' এই লুসাই পৰ্ব্বতে নানা বন্য জাতির বাস আছে। তন্মধ্যে বলবীৰ্য্যসম্পন্ন কুকী ও লুসাই জাতি সমধিক সাহসী। তাহার ইংরাজরাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে ভীত হয় না। কুকীদিগের বস্তবিক্রম ও তীরের অব্যর্থ সন্ধান ইংরাজসৈন্ত আসাম যুদ্ধে সম্যক উপলব্ধি করিয়াছিল। ১৮৭১-৭২ খৃষ্টাব্দে লুসাই অভিযানে ইংরাজ সেনাদলকে যেরূপ বিব্রত হইতে হইয়াছিল, তাহা ইতিহাসপাঠকবর্গের অবিদিত নাই। এই পৰ্ব্বতবাসী আদিম জাতি প্রধানত: লুসাই নামে পরিচিত। পৰ্ব্বতের অংশবিশেষে বাসহেতু তাহারা ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় অভিধা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ নামগুলি প্রধান সর্দারদিগের নাম হইতে গৃহীত হইয়াছে। লুসাই পৰ্ব্বতের সৰ্ব্বোত্তরভাগে অর্থাৎ মণিপুর ও নাগাশৈলের মধ্যভাগে কোইরেয়িং জাতির বাস। তাহার দক্ষিণাংশে কুপুই জাতি, ইহারা মণিপুররাজের প্রজা বলিয়া পরিগণিত ছিল। ইংরাজরাজ মণিপুর হস্তগত করিবার পর ইহারা ইংরাজগবমেন্টের অধীন হইয়াছে। কাছাড়ের দক্ষিণস্থ পৰ্ব্বতভাগে প্রকৃত লুসাইদিগের বাস। ঐ লুসাইগণ তিনটা প্রধান প্রধান সর্দারের অধীন ও তিনটী স্বতন্ত্র নামে পরিচিত। চট্টগ্রাম সীমান্তে এই লুসাইজাতির যতগুলি শাখার বাস আছে, তাহাদের মধ্যে হোলোঙ্গ, সাইলু ও থঙ্গলোবাগণই প্রধান। ইহার সকলেই ভ্রমণশীল, কখনই এক স্থানে বাস করে না । শত্রপক্ষীয়ের আক্রমণ নিবন্ধন, অথবা ভূমির উর্বরতাদি সম্বন্ধে অসুবিধা বোধ করিলে তাহারা বাসভূমি পরিত্যাগ করিয়া স্বচ্ছন্দে অন্ত স্থানে যাইয়া বাস করে । লুসাই সীমান্তে জনরব এইরূপ যে, ব্রহ্মরাজ্যের পূর্বকথিত পাৰ্ব্বত্য প্রদেশবাসী সোক্তি জাতির আক্রমণে ও উপদ্রবে প্রপীড়িত হইয়া লুসাইগণ পৰ্ব্বতের পূর্বাংশ পরিত্যাগ করিয়া দক্ষিণাভিমুখে ইংরাজাধিকারে সীমান্ত প্রদেশে আসিয়া পড়িয়ছে। আসাম-সীমান্তবাসী অন্তান্ত পাৰ্ব্বত্য জাতির সহিত লুসাইদিগের অনেক বিষয়ে পার্থক্য লক্ষিত হয়। তাহদের মধ্যে এক এক জন সর্দার থাকে। ঐ সর্দারবংশ পুরুষানুক্রমে তাহাদের রাজপদের অধিকারী। প্রত্যেক লুসাই-গ্রামেই এক এক জন 'লাল থাকে। তাহারাই দলের নেতা হইয়া বিপক্ষের সহিত যুদ্ধ করে। লাল সর্দারগণ সাধারণতঃ কোন রাজবংশ সমুদ্ভূত, প্রজা সাধারণ ইচ্ছাপূৰ্ব্বক তাহদের আদেশ মান্ত করিয়া থাকে এবং তিনিই গ্রামের হৰ্ত্তাকর্তা বলিয়া বিবেচিত। এই সকল লাল সর্দার সীমান্ত হইতে লুণ্ঠন করিয়া যত অধিক অর্থ ংগ্ৰহ করিতে পারে, তাহার দলে তত অধিক অনুচরসংখ্যা বদ্ধিত হয়। সর্দারের অবস্থানুসারে ক্রীতদাস রাখে, তাহার এই সকল লোককে যুদ্ধকালে বিপক্ষপক্ষ হইতে বন্দী করিয়া আনে। ক্রীতদাস ব্যতীত গ্রামস্থ অপরাপর প্রজাবৰ্গও আপন আপন পরিশ্রমলব্ধ অর্থের কতকাংশ সর্দারকে ভাগ দিয়া থাকে। লুসাইগণ জঙ্গল কাটিয়া ঝুম প্রথায় ধান্তাদির চাস কনি থাকে। যুদ্ধবিগ্রহ ও বন্যপশুশিকার তাহদের অন্যতম উপজীবিকা। তাহার গয়াল নামক বস্ত গোরু, পাৰ্ব্বতীয় ছাগ, শূকর ও অন্যান্য গৃহপালিত পশু পালন করে। ঐ গয়াল তাহার দেবপূজায় উৎসর্গ করিয়া থাকে। পুরুষেরাই গৃহস্থালীর যাবতীয় কৰ্ম্ম করে। তাহারা খদির, গদ, হস্তিদন্ত, বনজ তুলা ও মোম লইয়া পৰ্ব্বতপ্রান্তস্থিত ইংরাজাধিকৃত নগর বা বাজারে বিক্রয় করে এবং তৎপরিবর্তে চাউল, লবণ, তামাক ও পিত্তলের বাসন, কার্পাস বঙ্গ এবং রৌপ্য কিনিয়া লইয়া যায়। তাহারা পুরী নামক এক প্রকার মোট কাপড় প্রস্তুত করিয়া আপনার পরে এবং তাহা বাজারেও বিক্রয় করিতে আনে । স্ত্রীলোকেরা অলঙ্কার পরিতে ভাল বাসে। কর্ণালঙ্কারের পক্ষপাতী হইয়া রমণীরা কর্ণের নিম্নস্থ মাংসখণ্ডে হস্তিদন্ত বা গোলাকার কাষ্ঠথও পূরিয়া রাখে। এই ছিদ্র সময় সময় এরূপ বাড়িয়া পড়ে যে, তাহাতে তাহদের মুখাকৃতি কদাকার দেখা যায়। পুরুষেরা দৃঢ়কায় ও মাংসল, কিন্তু তাহাদের মুখাকৃতি সৰ্ব্বদাই বিরক্তিকর ও উগ্রভাবব্যঞ্জক। বহুকাল হইতে লুসাইজাতি ইংরাজাধিকার মধ্যে আসিয়া দয়াবৃত্তির পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া আদিতেছে। লুন্ঠনকালে তাহারা অসংখ্য নরহত্যা করিয়া তাহাদের মুণ্ড কাটিয়া লইয়া যাইত। অস্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় নরমুণ্ডদানে প্রেতাত্মার সদ্‌গতি হইবে, এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবৰ্ত্তী হইয় তাহারী এরূপ অমান্নুষিক অত্যাচারে ব্ৰতী হইত। কাছাড়, শ্ৰীহট্ট, ত্রিপুর, চট্টগ্রাম, পাৰ্ব্বত্য ত্রিপুরা ও মণিপুরের অধীনস্থ সামন্ত রাজ্যসমূহে তাহারা সময়ে সময়ে দলে দলে নামিয়া আসিয়া নররক্তে ধরা প্লাবিত করিয়াছিল। ১৭৭৭ খৃষ্টাব্দে ভারতের সৰ্ব্বপ্রথম গবর্ণর জেনারল ওয়ারেণ হেষ্টিংসের রাজত্বকালে কুকীদিগের এইরূপ প্রথম উপদ্রবের কথা শুনা যায়। তৎকালে চট্টগ্রামের একজন সর্দার কুকীদিগের অত্যাচার হইতে স্বীয় প্রজারক্ষণে অসমর্থ হইয়া ইংরাজপ্রতিনিধির নিকট একদল সিপাহী সেনার সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন। ১৮৪৯ খৃষ্টাব্দে