পাতা:বিশ্বকোষ প্রথম খণ্ড.djvu/৪৭৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অভিনয় আমরা গুণেরই অধিক আদর করি। কিন্তু গুণ দেখিলে ও গুণের কথা শুনিলে সেই গুণের আধার দেখিতে ইচ্ছা হয় । ফুৰ্য্যোধনের লোহার শরীর, পৰ্ব্বত শৃঙ্গের মত কঠিন। যে ভীম, লৌহগদা দিয়া সেই দুর্য্যোধনের উরু ভাঙ্গিয়াছিলেন, তাহাকে কোলে করিয়া দেখিবার নিমিত্ত ধৃতরাষ্ট্রের সহজেই ইচ্ছা হইয়াছিল। বনে থাকি, গাছের উপর বনের পার্থী মধুর সুরে গান ধরে, অমনি পার্থীট দেখিতে সাধ হয়। গোকুল বিপিনে শ্ৰীকৃষ্ণ বঁাশীতে স্থর পুরিয়া রাধা-নামে গান ধরিতেন, এখানে বঁাশীর রবে রাধিকার কাণ ভরিয়া যাইত, প্রাণপার্থী চঞ্চল হইয়া উঠিত। তাই এক দিন শ্ৰীকৃষ্ণকে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,—কোন্‌রস্কে পুরে ধ্বনি, রাধায় কর উদাসিনী, সাক্ষাভে বাজাও শুনি, আমার মাথ৷ ९्रां & । অতএব গুণ শুনিলে তাহার আধার দেখিবার নিমিত্ত লোকের স্বভাবতই ইচ্ছা জন্মে। কিন্তু গুণের সদৃশ আধার হইলে দেখিতে অধিক মনোহর হয়। সে কারণ অভিনেতৃগণকে স্বভব্য, রূপবান এবং সুসজ্জিত হওয়া আবণ্ঠক। এবং রঙ্গভূমি ও রঙ্গভূমির পটাদি সুচিত্রিত করা কর্তব্য । যাহারা ইউরোপীয় এবং পারসী ভাষা বুঝিতে পারেন না, সে সকল লোকও বাঙ্গালীদের চেয়ে ইউরোপীয় এবং পারসীদের রঙ্গভূমি এবং নটনটীর উত্তম সজ্জিত বলিয় তাহ দেথিয় অধিক মুগ্ধ হইয়া থাকেন। শ্রীতিমাধুর্য্য অভিনয়ের অার একটা প্রধান অঙ্গ। এই গুণ না থাকিলে অভিনয়কাৰ্য্য বিরক্তিকর হইয়৷ উঠে । বিজ্ঞলোকের বলেন, এই প্রধান গুণের অভাবে আকিকালিকার যাত্র অতিশয় কুৎসিত হইয়া উঠিয়াছে। বঁীয়ত্ব দেখাইবার সময়ে কেবল চীৎকারে আকাশ পাতাল ফাটাইলে বীরত্ব প্রকাশ করা হয় না। মৌখিক দম্ভ, হুঙ্কার, চীৎকারের সঙ্গে আস্ফালন—এ শরতের মেঘ গর্ডন। নিশাদ চণ্ডাল প্রভৃতি নীচ লোকেই এরূপ করে; বীরবংশের মহারাজদের এ সকল কাজ নহে। তাহার মনের তেজ, মনের দম্ভ এবং বীরোচিত কাৰ্য্য দেখাইয়। বীরত্ব প্রকাশ করিবেন । হুঙ্কার এবং অঙ্গাস্ফালনেরও সীমা আছে। শ্রুতিকটু না হয়, ইহার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া বীরত্ব প্রকাশ কর। কৰ্ত্তব্য । আর দুইট কারণে যাত্র প্রভৃতির অভিনয় কাৰ্য্যে মাধুৰ্য্য থাকে না। সে দুইটা কারণ—দীর্ঘ দীর্ঘ শব্দে [ 8&ર ] অভিনয় অধিক বক্ততার ছটা এবং অযথা বিলাপ। অভিনয় স্বভাবের অনুকরণ । আমরা সহজে ষেমন কথা কই, নাটকের ভাষা ঠিক তদ্রুপ হওয়া উচিত। ভদ্রলোকে ভদ্রের মত কথা কহিবেন, কিন্তু দীর্ঘচ্ছন্দে বড় বড় শব্দ দিয়া কথা কহিবেন না। ভবভূতির নাটক সকল গুণের অাকর, কিন্তু কবি এই দোষ ত্যাগ করিতে পারেন নাই। আজি কালিকার যাত্রাও এই দোষে অতিশয় দূষিত হইয়াছে। সে কারণ যথার্থ গুণগ্রাহী শ্রোতাদের প্রতিকর হয় না। সরল ও সচরাচর প্রচলিত শব্দে অভিনয়ের বিষয় রচিত হইলে লোকে সহজে মুগ্ধ হয় । অতি সুপণ্ডিত লোকেও কথা কহিবার সময়ে ‘মা’ বলিয়া ডাকেন, ‘মাতঃ’ বলেন না । সে কারণ করুণস্বরে ‘মা’ বলিয়া ডাকিলে কাণে সুধা ঢালিয়া দেয়, শরীর রোমাঞ্চিত হয় । কিন্তু ‘মাতঃ এ শব্দ মনকে ততট আকর্ষণ করিতে পারে না । শোক সময়ের বিলাপ রঙ্গভূমির আর একটা বিপ দের স্থল। আজি কালিকার যাত্রার কথ। ত কহিতেই নাই, সংস্কৃত মহানাটক এবং উত্তরচরিতেও এ বিপদের স্থল অনেক। রামচন্দ্র, কাপুরুষের মত সাঁতার জষ্ঠ এ রূপ বিলাপ করিয়াছেন যে, তাহ! শুনিতে বিরক্তি জন্মে । নাটকে নায়ক নায়িকায় চরিত্র রক্ষণ করাই প্রধান কাজ । মানুষ শোকের সময়ে কাতর হইবে, কিন্তু তখনও আপনার চরিত্র রক্ষা করা চাই। এ দেশের যাত্রা প্রভৃতিতে পরিহাস করিবার জন্ত অভিনেতৃগণ সং সাজিয়া থাকে। অশ্লীলতা, বান্বিতও। কুৎসিত বেশভূষা পরিত্যাগ করিয়া হাস্যরসোর্দীপক কৌতুককর ব্যাপারে এই কাজ করা আবশুক। তাহ হইলেই লোকের অধিক খ্ৰীতিকর হয় । দৃশুকাব্য, নাটক এবং যাত্রার পালা অভিনয়ের বিষয় এবং রঙ্গভূমিতে যে ব্যাপারদর্শিত হয়, তাহাই অভিনয় । ষে রঙ্গভূমিতে পটক্ষেপাদি দ্বারা কাৰ্য্য সম্পন্ন হয়, তাহাকে এখন আমরা নাটকাভিনয় কছি। এবং খোলা আসরে যেখানে পটক্ষেপাদি নাই, তাহাকে যাত্র বলিয়া থাকি । কিন্তু পূৰ্ব্বে এ প্রভেদ ছিল না। সে কালে নাটকাভিনয়কেও লোকে যাত্রা বলিত । বিদর্ভ নগরে কালপ্রিয়নাথ নামে মহাদেবের নিকট উত্তরচরিত যখন প্রথম অভিনীত হয়, ভবভূতি সেই সময়ে নান্দীতে বলিয়াছেন যে,—অদ্য থলু ভগবতঃ কালপ্রিয়নাথন্ত যাত্রায়াম্। আজি ভগবান কালপ্রিয়নাথের যাত্রাতে।