বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪১২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (ব্রাহ্মণপ্রভাব)
[৪১০]
বঙ্গদেশ (বৌদ্ধপ্রভাব)

ফিরিতে হয়। পাটলিপুত্রের পূর্ব্বে যবনেরা অগ্রসর হইতে সাহসী হন নাই। অনেকে মনে করেন যে, তৎকালে যবনেরা অশোককীর্ত্তিসমূহ ধ্বংস করিয়া যান। আবার বৌদ্ধগ্রন্থ মতে পুষ্যমিত্রই অশোকের কীর্ত্তিলোপের কারণ। যাহা হউক, যবন আক্রমণে মগধ রাজ্য অনেকটা বিশৃঙ্খল হইয়া পড়িয়াছিল। তৎপরে বৃদ্ধ নৃপতির মৃত্যু হইলে তাঁহার বংশধরকে ফাঁকি দিয়া অপরে রাজ্যগ্রহণের ষড়যন্ত্র করিতেছিল। সেই ষড়যন্ত্রের ফলে অভিনয় কালে মিত্রদেবের হস্তে অগ্নিমিত্র ছিন্নশিরা হইলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা অগ্নিমিত্রের কনিষ্ঠ সুজ্যেষ্ঠকে রাজা করিলেন। কিন্তু শুঙ্গ সুজ্যেষ্ঠের ভাগ্যেও বেশীদিন রাজ্যভোগ ঘটিল না। মহাবীর বসুমিত্র অল্পদিন পরেই পৈতৃক সিংহাসনে অভিষিক্ত হইলেন। বৈদিক ধর্ম্মপ্রচার করিবার জন্যই মহাবীর বসুমিত্র দাক্ষিণাত্য হইতে বেদজ্ঞ বিপ্র আনাইয়া তাঁহাদিগকে রাজগৃহ প্রদান করিয়াছিলেন। বসুমিত্র ও তৎপরবর্ত্তী অন্তক, পুলিন্দক, ঘোষবসু, বজ্রমিত্র, ভাগবত ও দেবভূমি প্রভৃতি শুঙ্গ রাজগণ সকলেই দেববিপ্রভক্ত ছিলেন। এই বংশ ১১২ বর্ষ অর্থাৎ প্রায় ৬৪ খৃঃ পূর্ব্বাব্দ পর্য্যন্ত রাজ্যভোগ করেন।

 দেবভূমি অতিলম্পট ও ব্যসনাসক্ত ছিলেন, তাঁহাকে বিনাশ করিয়া তাঁহার ব্রাহ্মণমন্ত্রী বসুদেব সিংহাসন অধিকার করেন। বসুদেব হইতেই কাণ্ব বা কাণ্বায়ন ব্রাহ্মণ-বংশের প্রতিষ্ঠা। বসুদেব, ভূমিমিত্র, নারায়ণ ও সুশর্ম্মা কাণ্ব বংশীয় এই ৪ জন নৃপতি ৪৫ বর্ষ মাত্র (প্রায় ২০ খৃঃ পূর্ব্বাব্দ পর্য্যন্ত) পাটলিপুত্রে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

 শুঙ্গ ও কাণ্বদিগকে শাকদ্বীপী বলিয়া মনে হয়। তাঁহাদের সময়ে কেবল পূর্ব্বভারত বলিয়া নহে, সমগ্র ভারতবর্ষে সৌরমত ও প্রতিমাপূজা প্রচলিত হয়। সৌর, ভাগবত, পাঞ্চরাত্র এবং পৌরাণিকগণেরও অভিনব অভ্যুত্থান হইয়াছিল।

 শুঙ্গ ও কাণ্বদিগের আধিপত্য কালেই উত্তর পশ্চিম ভারতে শকজাতির অভ্যুদয়। [ভারতবর্ষ শব্দে শক বিবরণ দ্রষ্টব্য।]

 বসুমিত্রসম্মানিত রাজ্যগৃহস্থিত বৈদিকবিপ্রগণ বৎস, উপমন্যু, কৌণ্ডিন্য, গর্গ, হারিত, গৌতম, শাণ্ডিল্য, ভরদ্বাজ, কৌশিক, কাশ্যপ, বশিষ্ঠ, বাৎস্য, সাবর্ণি ও পরাশর এই ১৪টী গোত্রে বিভক্ত ছিল। পরবর্ত্তীকালে এই সকল দাক্ষিণাত্য বিপ্রসন্তান বঙ্গের নানাস্থানে বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহারাও জৈন-বৌদ্ধপ্রভাবময় বঙ্গের জলবায়ুগুণে কিছুকাল পরে অনেকটা বৈদিকাচারভ্রষ্ট হইয়া পড়েন। এই সময়ে বঙ্গের স্থানে স্থানে বন্য প্রদেশে মেদ, কৈবর্ত্ত প্রভৃতি জাতির আধিপত্য হইতে দেখা যায়।

 দাক্ষিণাত্যের অন্ধ্ররাজগণের হস্তে কাণ্ববংশ রাজ্য হারাইয়া উত্তর পশ্চিমভারতে শকক্ষত্রপগণের আশ্রয় গ্রহণ করেন। আন্ধ্রগণ পাটলিপুত্র অধিকার করিলেও এখানকার রাজধানী তাঁহাদের বাসপোযোগী হয় নাই। তাঁহারা এখানে প্রতিনিধি রাখিয়া দাক্ষিণাত্যে প্রস্থান করেন। যাহা হউক, তৎকালে পূর্ব্বভারতে দ্রাবিড়ীয় আচার কতকটা প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল। কিন্তু প্রতিনিধিগণের স্বার্থ সাধনচেষ্টায় রাজ্য মধ্যে অন্তবিপ্লবের সূচনা হইল; তাহারই ফলে অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধরাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হইয়া এক এক স্বাধীন নরপতির শাসনাধীন হইয়া পড়িল। এ সময়ে পশ্চিম প্রদেশে শকাধিপত্য দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। শাকদ্বীপী কাণ্বব্রাহ্মণদিগের ধর্ম্মোপদেশে শাকরাজগণ ভারতীয় দেববিপ্রপূজক ও প্রজারঞ্জক হইয়া পড়িলেন। প্রজাগণও তাঁহাদের অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। সুতরাং পূর্ব্বদিকে আধিপত্য বিস্তারের সময় তাঁহাদিগকে বেশী কষ্ট পাইতে হয় নাই। শকদিগের শুভদিন আসিয়া পড়িল।

 খৃষ্টীয় ১ম শতাব্দে শকাধিপ কনিষ্ঠ ভারত সম্রাট্ হইলেন। সারনাথের ভূগর্ভ হইতে সম্প্রতি মহারাজ কনিষ্কের যে স্তম্ভ লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার অনুসরণ করিলে মনে হইবে, যে পূর্ব্বভারতও কনিষ্কের সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল। তিনি অনেকটা উদারনৈতিক হইলেও তাঁহার শিলালিপিসমূহ তাঁহার বৌদ্ধধর্ম্মানুরাগ ঘোষণা করিতেছে। তাঁহার যত্নে বারাণসীর ন্যায় অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গেও মহাযান বৌদ্ধমত প্রচারিত হইয়াছিল।

 মহারাজ কনিষ্কের পুরুষপরে (বর্ত্তমান পেশাবরে) রাজধানী ছিল। তিনি এই সুদূর পশ্চিম সীমান্তে অধিষ্ঠিত থাকিয়াও কাসঘর, য়ারকন্দ, খোতন প্রভৃতি মধ্য এসিয়াস্থ সুদূর উত্তর প্রদেশ হইতে দক্ষিণে বিন্ধ্যাদ্রি এবং পূর্ব্বে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গে পর্য্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন। ‘ধর্ম্মপিটকসম্প্রদায়নিদান’নামক বৌদ্ধগ্রন্থমতে মহারাজ কনিষ্ক পাটলিপুত্রে আসিয়া এখানকার রাজাকে জয় করিয়া বৌদ্ধস্থবির অশ্বঘোষকে লইয়া যান। সম্প্রতি সারনাথ হইতে তথাকার সমতল ভূমির ১০ হাত মৃত্তিকা নিম্নে সম্রাট্ কনিষ্কের শিলালিপি ও কীর্ত্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে। ঐ শিলালিপি হইতে জানা যায়, তৎকালে বারাণসীপ্রদেশ মহারাজ কনিষ্কের অধীন খরপল্লল নামক এক (শক) ক্ষত্রপের শাসনাধীন ছিল। পাটলিপুত্রের প্রাচীন ভূগর্ভ রীতিমত খনিত ও উদ্ঘটিত হইলে সারনাথের ন্যায় সুপ্রাচীন কনিষ্ককীর্ত্তি আবিষ্কৃত হইতে পারে। তাহা হইলে আমরা জানিতে পারিব, পূর্ব্বভারতে তাঁহার অধীনে কোন্ ক্ষত্রপ (Satrap) আধিপত্য করিতেছিলেন।