বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪১৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (বৌদ্ধ ও শৈবপ্রভাব)
[৪১১]
বঙ্গদেশ (ব্রাহ্মণ্যপ্রভাব)

 কনিষ্কের প্রভাবেই শক, যবন, পারদ ও ভারতীয় ভাস্করশিল্পের সমীকরণ হয়। সম্রাট্ অশোকের সময় কেবল ভারত বলিয়া নহে, সুদূর মধ্যএসিয়া ও যুরোপখণ্ডে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচারিত হইলেও বুদ্ধদেবের কোন প্রকার প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। অশোকের সময় বুদ্ধপ্রতিমা-পূজার আবশ্যকতাও কেহ হৃদয়ঙ্গম করেন নাই। আমরা পূর্ব্বেই লিখিয়াছি যে, শাকদ্বীপায়গণই ভারতে দেবপ্রতিমা নির্ম্মাণ করিয়া প্রচার করেন। এই প্রথার অনুবর্ত্তী হইয়া মহাযান মত প্রচারের সহিত শাকপতি বুদ্ধের লীলাবিষয়িণী নানা প্রতিমা গড়াইয়া ভারতের নানা পুণ্যস্থানে প্রতিষ্ঠিত করিতে লাগিলেন। সেই সকল অপূর্ব্ব ভাস্করশিল্পের নিদর্শন ভারতের নানা স্থান হইতেই আবিষ্কৃত হইয়াছে। ঐ সকলের শিল্পনৈপুণ্যদর্শনে ভারতীয় শিল্পিগণ সভ্যজগতের প্রশংসাভাজন হইয়াছেন।

 কনিষ্ক যে মহাযান মত প্রচার করিয়া যান, কালে তাহা সংশোধিত ও পরিবর্ত্তিত হইয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম্মের সৃষ্টি করিয়াছিল। একদিন সমস্ত বঙ্গদেশ এই তান্ত্রিক বৌদ্ধসাগরে ডুবিয়া গিয়াছিল, সে কথা পরে লিখিব।

 মহারাজ কনিষ্কের পর তৎপুত্র হুবিষ্ক বা হুষ্ক সিংহাসনে অভিষিক্ত হইলেন। পেশাবর হইতে পূর্ব্ব বঙ্গ পর্য্যন্ত তাঁহার অধিকারভুক্ত ছিল। নানাস্থান হইতে তাঁহার যে সকল শিলালিপি ও মুদ্রালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা হইতে মনে হয় যে, তিনি তাঁহার পিতৃদের অপেক্ষা দীর্ঘকাল সাম্রাজ্য শাসন করেন। তাঁহারও সময়ে পূর্ব্বভারত শাসন করিবার জন্য পাটলিপুত্রে তাঁহার অধীনে একজন ক্ষত্রপ অধিষ্ঠিত ছিলেন।

 হুবিষ্কের পুত্র শকাধিপ বসুদেব বা বাসুদেব। তিনি ৭৪ হইতে ৯৮ শকাব্দ পর্য্যন্ত সাম্রাজ্যভোগ করেন। তাঁহার মুদ্রায় শিব, ত্রিশূল ও নন্দিমূর্ত্তি অঙ্কিত থাকায় তাঁহাকে শৈব নরপতি বলিয়াই গ্রহণ করা যায়। কনিষ্ক যে সুবিস্তীর্ণ সাম্রাজোর পত্তন করিয়া যান, বসুদেবের সময় তাহার ধ্বংসের সূত্রপাত হইল। সম্ভবতঃ তাঁহার ধর্ম্মান্তর গ্রহণে তাঁহার অধীন দূরদেশবাসী ক্ষত্রপগণ বিরক্ত হইয়া সকলে স্বাধীন হইতে থাকেন। তন্মধ্যে উজ্জয়িনীপতি রুদ্রদাম প্রধান। তিনি অল্পকাল মধ্যেই অবন্তী, অনূপ, নীবৃদ্, আনর্ত্ত, সুরাষ্ট্র, শ্বভ্র, ভরুকচ্ছ, সিন্ধু, সৌবীর, কুকুর, অপরান্ত, নিষাদ প্রভৃতি জনপদ অধিকার করিয়া মহাক্ষত্রপ উপাধি গ্রহণ করেন। পাটলিপুত্রের ক্ষত্রপও তদনুবর্ত্তী হইয়াছিলেন। এই রাজদ্রোহিতার সময়ে পাটলিপুত্রের নিকট লিচ্ছবিগণ প্রবল হইয়া উঠে। অঙ্গ-বঙ্গের সামন্তরাজগণও স্বাধীনতা অবলম্বন করেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পারসিক সাসনবংশ মস্তকোত্তলন করিতে
থাকেন। বলিতে কি, বসুদেবের মৃত্যুর সহিত উত্তরভারতীয় শাকসাম্রাজ্য ধ্বংস হইল এবং আভীর, গর্দ্দভিল্ল, লিচ্ছবি, নাগ, হৈহয় প্রভৃতি জাতি নানাস্থান অধিকার করিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সৃষ্টি করিল, ক্ষত্রপনাম উত্তরভারত হইতে বিলুপ্ত হইল।

 খৃষ্টীয় ২য় শতাব্দের শেষভাগে লিচ্ছবিগণ পাটলিপুত্র অধিকার করেন। দুঃখের বিষয়, তাঁহাদের ইতিহাস লিখিবার উপকরণ এখনও বাহির হয় নাই। পূর্ব্বভারতের নানা স্থানে কর্ত্তৃত্বস্থাপনে প্রয়াসী সামন্তগণের দ্বারা অন্তর্বিদ্রোহ উপস্থিত হয়, তাহার ফলে অনেক রাজকুমার স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া সুদূর কম্বোজ (বর্ত্তমান কম্বোডিয়া), অঙ্গদ্বীপ (অণ্ণম্) ও যবদ্বীপে গমন করেন এবং নবজিত কম্বোজ প্রভৃতি স্থানে শৈব ও ব্রাহ্মকীর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত করেন; বহুশত বর্ষ অতীত হইতে চলিল, এখনও সেই সকল হিন্দুকীর্ত্তি বিদ্যমান রহিয়াছে।

 খৃষ্টীর ৩য় শতাব্দে মধ্যভারতে ত্রৈকূটক বা হৈহয়বংশ প্রবল হইয়া উঠে। এই বংশীয় ঈশ্বরদত্ত ২৪৯ খৃষ্টাব্দে উজ্জয়িনীর ক্ষত্রপদিগকে পরাজয় করিয়া চেদি বা কলচুরি সংবৎ প্রবর্ত্তন করেন। তাঁহার অভ্যুদয়ে হৈহয়গণ অঙ্গবঙ্গ অধিকারের চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁহাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। খৃষ্টীয় ৩য় শতাব্দের শেষভাগে গুপ্ত ও তৎপুত্র ঘটোৎকচ নামে দুইজন সামন্ত-মহারাজ মগধে প্রবল হইয়া উঠেন। ঘটোৎকচের পুত্র ১ম চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবি-রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করিয়া পাটলিপুত্রের সিংহাসন লাভ করেন। অল্পদিন মধ্যে তিনি আর্য্যাবর্ত্তের সম্রাট্ হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাঁহার সময়ে পুষ্করাধিপ চন্দ্রবর্ম্মা বঙ্গদেশ জয় করেন। বাঁকুড়ার সুশুনিয়া পাহাড়ে চন্দ্রবর্ম্মার শিলালিপি উৎকীর্ণ আছে। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন। ১ম চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। এই অশ্বমেধ উপলক্ষে তিনি মহাবীর চন্দ্রবর্ম্মা, রুদ্রদেব, মতিল, নাগদত্ত, গণপতিনাগ, নন্দী, বলবর্ম্মা প্রভৃতি আর্য্যাবর্ত্তের নরপতিগণকে পরাজয় করিয়াছিলেন। এছাড়া অচ্যুত ও নাগসেনের ধ্বংসসাধন, এবং কোশলাধিপ মহেন্দ্র, মহাকান্তারপতি ব্যাঘ্ররাজ, কেরলপতি মণ্টরাজ, পিষ্টপুরাধিপ মহেন্দ্র, কোট্টারপতি স্বামিদত্ত, এরণ্ডপল্লির দমন, কাঞ্চীর বিষ্ণুগোপ, অবিমুক্তের নীলরাজ, বেঙ্গির হস্তিবর্ম্মা, পলক্কের উগ্রসেন, দেবরাষ্ট্রপতি কুবের, কুস্থলপুরাধিপ ধনঞ্জয় প্রভৃতি দক্ষিণাপথের নরপতিগণকে পরাজয় ও পরে মুক্তিদান করিয়া তিনি ভারতের সার্ব্বভৌম অধীশ্বর হইয়াছিল। দৈবপুত্র, শাহী, শাহানুশাহী, শক, মুরুণ্ড, এবং সিংহল ও অপর দ্বীপবাসিগণও তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল। পশ্চিমে আফগানস্তান হইতে পূর্ব্বে কামরূপ চট্টগ্রাম, উত্তরে নেপাল হইতে দক্ষিণে সিংহল পর্য্যন্ত তাঁহার