অধিকারভুক্ত হইয়াছিল। ঐ সময়ে বঙ্গদেশে সমতট ও ডবাক রাজ্য গঠিত হইয়াছিল। বঙ্গদেশের বিভিন্ন ভূভাগ শাসন করিবার জন্য সমুদ্রগুপ্ত তাঁহার আত্মীয় স্বজনকে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহারা অর্দ্ধস্বাধীন সামন্তরূপে পাটলিপুত্রাধিষ্ঠিত গুপ্তসম্রাট্গণের পরামর্শে অনেক সময় বঙ্গরাজ্য শাসন করিতেন। তাঁহাদের যত্নে বঙ্গদেশে নানা বৈদিক মিশ্রিত পৌরাণিক ধর্ম্মমত প্রচারিত হইতে থাকে।
খৃষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দী হইতে ৭ম শতাব্দী পর্য্যন্ত বঙ্গের নানাস্থানে গুপ্তরাজগণ প্রবল ছিলেন এবং তাঁহাদের অধীনে কায়স্থসামন্তগণ বঙ্গশাসন করিতেছিলেন। কর্ণসুবর্ণে প্রধানতঃ গুপ্তরাজগণের রাজধানী ছিল। পূর্ব্বেই দেখাইয়াছি, অতি পূর্ব্বকাল হইতেই বঙ্গদেশে জৈন ও বৌদ্ধধর্ম্ম সাধারণের হৃদয় অধিকার করিয়াছিল। মধ্যে শুঙ্গ ও কাণ্ববংশের যত্নে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্ম প্রচারিত হইলেও তাহা সাধারণের রুচিসঙ্গত হয় নাই। মহারাজ কনিষ্কের সময় ক্রিয়াকাণ্ডবহুল ও বহু দেবদেবীপূজামূলক মহাযান মত প্রচারিত হয়, তাহাই জন সাধারণের মনোমত হইয়াছিল। সুতরাং গুপ্তরাজগণের ব্রাহ্মণ্য-ধর্ম্মপ্রচারে যত্ন ও আগ্রহ থাকিলেও খৃষ্টীয় ৫ম শতাব্দ পর্য্যন্ত গৌড়বঙ্গে বৌদ্ধ ও হিন্দুগণের সমান প্রভাব ছিল। ব্রাহ্মণভক্ত গুপ্তরাজগণ হিন্দুশাস্ত্রানুসারে সাধারণের মতিগতি ফিরাইবার জন্য চেষ্টা করিলেও তিনি বৌদ্ধশ্রমণ বা শ্রাবকের প্রতি বিদ্বেষভাব দেখাইতে সাহসী হন নাই। মহাযান মতের রূপান্তর তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম্ম জন-সাধারণের মধ্যে বিশেষ সমাদৃত হওয়ায় গুপ্ত নৃপালগণ নিষ্ঠাবান্ শৈব অথবা বৈষ্ণব হইলেও সাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য তান্ত্রিক বৌদ্ধ দেবদেবীর পূজায় উৎসাহ দান করিতেন। এমন কি, কোন কোন গুপ্তরাজ গোঁড়া তান্ত্রিক হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সকল গুপ্তরাজগণের মুদ্রায় তান্ত্রিক দেবদেবীর মূর্ত্তি উৎকীর্ণ দেখা যায়। বলিতে কি, খৃষ্টীয় ৫ম শতাব্দীতে গুপ্তরাজগণের আধিপত্য কালেই গৌড়বঙ্গে তান্ত্রিক ধর্ম্মের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। তাঁহাদের উৎসাহেই গৌড়ীয় তান্ত্রিকগণের নিকট হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম্মের সমন্বয় সাধিত হইয়াছিল। তান্ত্রিকগণের প্রভাবে বৈদিকতা এক প্রকার বিলুপ্ত হইয়াছিল। এখানকার তান্ত্রিক প্রভাব কেবল গৌড় ও বঙ্গ বলিয়া নহে, সুদূর উত্তরে কাশ্মীর ও চীনদেশে, পূর্ব্বে চীনসমুদ্রের উপকূলবর্ত্তী আনাম ও কম্বোজ রাজ্যে এবং দক্ষিণে যবদ্বীপ, সুমাত্রা ও সিংহলে পর্য্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। কম্বোজ ও যবদ্বীপ হইতে নির্জ্জন বন মধ্যে যে সকল প্রাচীন তান্ত্রিক দেবদেবীমূর্ত্তি ও শিলালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা পর্য্যালোচনা করিলে বুঝা যায় যে, ঐ সকল শিল্প মধ্যে গৌড়-বঙ্গের বৈষ্ণব, শৈব অথবা শাক্ত স্মৃতির অভাবগুপ্তসম্রাট্গণ সকলেই দেবব্রাহ্মণভক্ত, শৈব বা বৈষ্ণব ধর্ম্মাবলম্বী হইলেও তাঁহারা বিশেষ বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। প্রায় ৪০৭ খৃষ্টাব্দে গুপ্তসম্রাট্ ২য় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের সময় প্রসিদ্ধ চীনপরিব্রাজক ফা-হিয়ান্ গুপ্তরাজধানী পাটলিপুত্রে আগমন করেন। তিনি এখানে অশোকের অম্বরচুম্বি প্রভূত স্থাপত্যের আকর বিশাল রাজভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখিয়া বিস্ময়বিমূঢ় হইয়াছিলেন। তিনি হীনযান ও মহাযান উভয় সম্প্রদায়ের সঙ্ঘারাম ও মঠ দেখিয়াছিলেন। এই সকল সঙ্ঘারামে প্রায় ছয় সাত শত আচার্য্য অবস্থিতি করিতেন। তখনও জগতের সকল স্থান হইতে বৌদ্ধতত্ত্বানুরাগী প্রধান আচার্য্যগণ এখানে আসিয়া সমবেত হইতেন। শ্রমণ ও পণ্ডিতগণ সকলেই এখানে ধর্ম্মোপদেশ লাভ করিবার জন্য আগমন করিতেন। এখানে ফা-হিয়ান্ বুদ্ধদেবের রথযাত্রা মহোৎসব উজ্জ্বল ভাষায় বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। এখানে তিন বর্ষকাল থাকিয়া তিনি সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করেন এবং বুদ্ধের ধর্ম্মোপদেশ নকল করিয়া লয়েন। পাটলিপুত্র হইতে চম্পায় আসিয়াও তিনি বহুতর বৌদ্ধকীর্ত্তি দর্শন করিয়াছিলেন। তৎপরে সমুদ্রোপকূলবর্ত্তী তাম্রলিপ্ত নগরে আসিয়াও তিনি ২৪টী সঙ্ঘারাম ও বহুতর বৌদ্ধাচার্য্য সন্দর্শন করেন। এখানেও চীনপরিব্রাজক দুই বর্ষকাল থাকিয়া বহুতর বৌদ্ধসূত্র নকল করেন ও বৌদ্ধ দেবমূর্ত্তি আঁকিয়া লয়েন। তিনি হিন্দুদিগকে ঘৃণার
- ↑ Anecdota Oxoniensis, Aryan series, part iii.