গোপালের পুত্র ধর্ম্মপাল প্রায় ৭৮৫ খৃষ্টাব্দে পিতৃসিংহাসন লাভ করিয়া যথেষ্ট বলসঞ্চয় করিতেছিলেন। তাঁহার একান্ত প্রতাপ ও আধিপত্য অল্পদিন মধ্যেই সমস্ত উত্তর গৌড়ে বিস্তৃত হইয়া পড়িল। তৎকালে দাক্ষিণাত্যে রাষ্ট্রকূট-সিংহাসনে গোবিন্দ শ্রীবল্লভ এবং উত্তরভারতে যশোবর্ম্মপুত্র চক্রায়ুধ আমরাজ অধিষ্ঠিত ছিলেন। ঐ দুই পরাক্রান্ত নৃপতির সহিত ধর্ম্মপাল আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ হইলেন।[ব্যাখ্যা ১]
এইরূপে বলদৃপ্ত হইয়া বৌদ্ধভূপতি ধর্ম্মপাল মহারাজ ভূশূরের রাজ্য আক্রমণ করিলেন। ভূশূর বৌদ্ধ অভিযান কিছুতেই নিবারণ করিতে সমর্থ হুইলেন না। তিনি ধর্ম্মপালের নিকট পৌণ্ড্রবর্দ্ধন হারাইয়া রাঢ়দেশ আশ্রয় করিতে বাধ্য হইলেন। রাঢ়বাসী সপ্তশতী ব্রাহ্মণগণের সাহায্যে আদিশূর গৌড়ের অধীশ্বর হইয়াছিলেন, এখন তাঁহাদের বংশধরগণ ভূশূরকে আশ্রয়দান করিলেন। ধর্ম্মপাল ও তৎপরবর্ত্তী পালরাজগণ এক প্রকার পূর্ব্বভারতের অধীশ্বর হইলেও রাঢ়দেশ অধিকারে সমর্থ হন নাই। তিনি রাঢ়দেশ অধিকারের জন্য নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। তাঁহার তাম্রশাসন হইতেই জানা যায় যে, তিনি রাঢ়দেশীয় ব্রাহ্মণদিগকে হস্তগত করিবার জন্য পৌণ্ড্রবর্দ্ধনভুক্তির মধ্যে তাঁহাদিগকে বহু সমৃদ্ধ গ্রাম প্রদান করিয়াছিলেন; কিন্তু ধর্ম্মপালের সকল কৌশল ব্যর্থ হইয়াছিল। রাঢ়ের ক্ষমতাশালী সপ্তশতী ব্রাহ্মণগণই আপনাদের সুদৃঢ় ও দুর্ভেদ্য আশ্রয়ে শূররাজবংশকে রক্ষা করিয়াছিলেন। এখানে ভূশূর ও তাঁহার বংশধরগণ বহুকাল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মরক্ষাপূর্ব্বক স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করিয়া গিয়াছেন।
পৌণ্ড্রবর্দ্ধন বৌদ্ধ নৃপতি ধর্ম্মপালের শাসনাধীন হইলে, দেশের মধ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধসংঘর্ষে একটা আন্তর্জাতিক বিপ্লব উপস্থিত হইল। এই বিপ্লবের সময় উক্ত সাগ্নিক বিপ্রগণের সন্তানগণ মধ্যে কেহ পৌণ্ড্রবর্দ্ধনের নিকটবর্ত্তী বরেন্দ্রভূমে স্ব স্ব ব্রাহ্মণশাসনে রহিলেন, কেহ বা তাঁহাদের আশ্রয়দাতা ও প্রতিপালক শূর-নরপতির সহিত রাঢ়দেশবাসী হইলেন। কেহ দাক্ষিণাত্য, কেহ বা পাশ্চাত্য সমাজে মিশিলেন। যে কয়জন সাগ্নিক বিপ্রসন্তান ভূশূরের সহিত রাঢ়দেশবাসী হইয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে শাণ্ডিল্যগোত্র ভট্টনারায়ণ, কাশ্যপগোত্র দক্ষ, বাৎস্যগোত্র ছান্দড়, ভরদ্বাজগোত্র শ্রীহর্ষ ও সাবর্ণগোত্র বেদগর্ভ, এই পঞ্চ মহাত্মার নাম রাঢ়ীয় কুলগ্রন্থে গৃহীত হইয়াছে। এই পঞ্চ বিপ্র ব্যতীত আরও অনেকে রাঢ়বাসী হইয়াছিলেন, কাঞ্জিবিল্লীয় নারায়ণের “ছন্দোগ-
- ↑ ভাগলপুর হইতে আবিষ্কৃত নারায়ণপালের তাম্রশাসন ও প্রভাবকচরিত দ্রষ্টব্য।
পূর্ব্বেই লিখিয়াছি যে, গৌড়পতি আদিশূর জয়ন্তের সময়ে তাঁহার প্রতিনিধিরূপেই হউক অথবা মহাসামন্তরূপেই হউক, আদিত্যশূর নামে তাঁহার এক আত্মীয় উত্তররাঢ়ের সিংহেশ্বরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁহারও সভায় ব্রাহ্মণকায়স্থের আগমন হইয়াছিল।[ব্যাখ্যা ২] আদিশূরের পুত্র ভূশূর পৌণ্ড্রবর্দ্ধন হারাইয়া জ্ঞাতিবিরোধের আশঙ্কায় উত্তররাঢ়ে না থাকিয়া দক্ষিণরাঢ়ে আসিয়া বাস করেন। আদিশূরবংশ ৭ পুরুষ রাজ্যশাসন করিয়া ছিলেন, রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ কুলগ্রন্থে সপ্তজনের নাম এইরূপ পাওয়া যায়—
“আদিশূরো ভূশূরশ্চ ক্ষিতিশূরোঽবনীশূরঃ।
ধরণীশূরকশ্চাপি ধরাশূরো রণশূরঃ॥
এতে সপ্ত শূরাঃ প্রোক্তাঃ ক্রমশঃ সুতবর্ণিতাঃ।
বেদবাণাঙ্গশাকে তু নৃপোঽভূচ্চাদিশূরকঃ।
বসুকর্ম্মাঙ্গিকে শাকে গৌড়ে বিপ্রাঃ সমাগতাঃ॥”
অর্থাৎ ১ম আদিশূর, তৎপুত্র ভূশূর, তৎপুত্র ক্ষিতিশূর, তৎপুত্র অবনীশূর, তৎপুত্র ধরণীশূর, তৎপুত্র ধরাশূর এবং ধরাশূরের পুত্র রণশূর শূরবংশে এই সপ্ত নৃপতি রাজত্ব করেন।[ব্যাখ্যা ৩] ইঁহাদের মধ্যে আদিশূর ৬৫৪ শকে (অর্থাৎ ৭৩২ খৃষ্টাব্দে) রাজা হন এবং
- ↑ বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ১মাংশ ৩৪২ পৃঃ ও ৬ষ্ঠ অংশ ২০-২৩ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
- ↑ কুলানন্দ রচিত উত্তররাঢ়ীয় কায়স্থকারিকায় লিখিত আছে—
“গৌড়দেশে মহারাজা আদিত্যশূর নাম।
গঙ্গার সমীপে বাস সিংহেশ্বর গ্রাম॥
আদর করিয়া আনে বিপ্র পঞ্চজন।
সেই সঙ্গে পঞ্চ গোত্র আইল শ্রীকরণ॥
শুন শুন কুলবর কথা পুরাতন।
রাজার সভায় কার্য্য করে পঞ্চজন॥
অতি বড় মহারাজ বুদ্ধে বৃহস্পতি।
পঞ্চজনার নাম থুইল পঞ্চ খেয়াতি।” ইত্যাদি। - ↑ কেহ কেহ শূরবংশে প্রদ্যুম্নশূর প্রভৃতি কএকজন শূর নৃপতির নাম করিয়াছেন, কিন্তু কোন প্রাচীন ইতিহাসে বা কুলগ্রন্থে প্রদ্যুম্নশূরের নাম নাই।