বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪২১

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (পালবংশ)
[৪১৯]
বঙ্গদেশ (বর্ম্মবংশ)

 নিম্নে পালরাজগণের রাজ্যকালনির্দ্দেশের তালিকা উদ্ধৃত হইল—

রাজার নাম   রাজ্যকাল
১। গোপাল (মগধে) ৭৭৫—৭৮৫ খৃঃ অঃ।
২। ধর্ম্মপাল (মগধ ও গৌড়ে) ৭৮৫—৮৩০ খৃঃ অঃ
৩। দেবপাল (মগধ ও গৌড়ে) ৮৩০—৮৬৫ খৃঃ অঃ
৪। শূরপাল ১ম (মগধ ও গৌড়ে) ৮৬৫—৮৭৫ খৃঃ অঃ
৫। বিগ্রহপাল ১ম (মগধ ও গৌড়ে) ৮৭৫—৯০০ খৃঃ অঃ
৬। নারায়ণপাল (মগধ ও গৌড়ে) ৯০০—৯২৫ খৃঃ অঃ
৭। রাজ্যপাল (মগধ ও গৌড়ে) ৯২৫—৯৫০ খৃঃ অঃ
৮। গোপাল ২য় (মগধ ও গৌড়ে) ৯৫০—৯৭০ খৃঃ অঃ
৯। বিগ্রহপাল ২য় (মগধ ও গৌড়ে) ৯৭০—৯৮০ খৃঃ অঃ
১০। মহীপাল ১ম (মগধ ও গৌড়ে) ৯৮০—৯৮০১০৩৬ খৃঃ অঃ
১১। নয়পাল (মগধ ও গৌড়ে) ১০৩৬—৯৮০১০৫৩ খৃঃ অঃ
১২। বিগ্রহপাল ৩য় (মগধ ও গৌড়ে) ১০৫৩—৯৮০১০৬৮ খৃঃ অঃ
১৩। মহীপাল ২য় (মগধ ও গৌড়ে) ১০৬৮—৯৮০১০৭৮ খৃঃ অঃ
১৪। শূরপাল ২য় (মগধ ও গৌড়ে) ১০৭৮—৯৮০১০৯১ খৃঃ অঃ
১৫। রামপাল (মগধ ও উত্তর গৌড়ে) ১০৯১—৯৮০১১০৩ খৃঃ অঃ
১৬। কুমারপাল (মগধ ও গৌড়ে) ১১০৩—৯৮০১১১০ খৃঃ অঃ
১৭। গোপাল ৩য় (মগধ ও গৌড়ে) ১১১০—৯৮০১১১৫ খৃঃ অঃ
১৮। মদনপাল (মগধ ও গৌড়ে) ১১১৫—৯৮০১১৩০ খৃঃ অঃ
১৯। মহেন্দ্রপাল (মগধ ও গৌড়ে) ১১৩০—৯৮০১১৪০ খৃঃ অঃ
২০। গোবিন্দপাল (মগধ ও গৌড়ে) ১১৪০—৯৮০১১৬১ খৃঃ অঃ
 পূর্ব্বে লিখিয়াছি, খৃষ্টীয় ৭ম শতাব্দে পূর্ব্ববঙ্গে খড়্গবংশের অভ্যুদয় হইয়াছিল, আদিশূরের অভ্যুদয়ে এই খড়্গবংশের শাসন বিলুপ্ত হয়। আদিশূরের পরলোক এবং শূরবংশের প্রভাবহ্রাসের সহিত এখানে পুনরায় বৌদ্ধগণ প্রবল হইয়া উঠে। তাহাদের আনুকূল্যে বৌদ্ধ পালরাজগণ অল্পায়াসে সমতট বা পূর্ব্ববঙ্গ অধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। পালবংশীয় কোন্ কোন্ রাজা এই প্রদেশ শাসন করেন, তাঁহাদের ধারাবাহিক নাম পাওয়া যায় না। গৌড়ের মূল পালবংশীয় রাজাদিগেরই কোন শাখা পূর্ব্ববঙ্গে স্থানে স্থানে শাসনকর্ত্তৃত্ব লাভ করিয়াছিলেন। এখানকার প্রবাদ অনুসারে তালিপাবাদ পরগণায় মাধবপুরে যশপাল, ভাওয়ালের অন্তর্গত কাপাসিয়ায় শিশুপাল এবং সাভারের নিকটবর্ত্তী কাটীবাড়ীতে হরিশ্চন্দ্র রাজত্ব করিতেন। হরিশ্চন্দ্রের প্রভাব উত্তরে রঙ্গপুর পর্য্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। প্রবাদ অনুসারে এই হরিশ্চন্দ্রের বংশেই বিষয়বিরাগী বৌদ্ধ নৃপতি মাণিকচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্র জন্ম গ্রহণ করেন। মাণিকচাঁদ ও গোপীচাঁদের অপূর্ব্বস্বার্থত্যাগ ও সন্ন্যাসের
গাথা আজিও রঙ্গপুর ও পূর্ব্ববঙ্গে যোগী জাতির মধ্যে গীত হইয়া থাকে।

 বিষয়বিরক্ত এই সকল বৌদ্ধ নৃপতি সম্ভবতঃ পালবংশীয় ছিলেন, এই কারণেই বোধ হয় গোবিন্দচন্দ্র বা গোপীচন্দ্র প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে “গোপীপাল” নামেও প্রখ্যাত হইয়াছেন।[ব্যাখ্যা ১] এই গোবিন্দচন্দ্রের সময়ে বিক্রমপুরে বৌদ্ধ মহা-তান্ত্রিক ও পরম জ্ঞানী দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্ম হয়। ১০১১ কি ১০১২ খৃষ্টাব্দে দিগ্বিজয়ী দাক্ষিণাত্য-পতি রাজেন্দ্র চোল গোবিন্দচন্দ্রকে পরাজয় করেন।


পূর্ব্ববঙ্গে বর্ম্মবংশ।

 জৈনপতি রাজেন্দ্র চোলের আক্রমণে পূর্ব্ববঙ্গ হীনবল হইয়া পড়ে। এই সময়ে বিক্রমপুরে বর্ম্মবংশের অভ্যুদয়। বর্ম্মবংশীয় কোন্ ভূপতি সর্ব্ব প্রথম পূর্ব্ববঙ্গ অধিকার করেন, তাহা এখনও জানা যায় নাই। এই বংশে হরিবর্ম্মদেব নামে এক প্রবল পরাক্রান্ত বৈষ্ণব নৃপতির ইতিহাস পাওয়া গিয়াছে। শিলালিপি, তাম্রশাসন ও বৈদিক কুলগ্রন্থে এই নরপালের কীর্ত্তি ও পরিচয় বিবৃত রহিয়াছে। পাশ্চাত্য বৈদিক কুলসম্ভূত রাঘবেন্দ্র কবিশেখর হরিবর্ম্মদেবের এইরূপ পরিচয় দিয়াছেন—

 ‘যাঁহার প্রচণ্ড ভুজদণ্ডালঙ্কৃত করাল করবালভয়ে দক্ষিণাপথ হইতে সমাগত বহুসংখ্যক শত্রুরাজগণ প্রকম্পিত হইত, জৈন ও বৌদ্ধ প্রভৃতি বিধর্ম্মিগণের যিনি শান্তিসুখ বিদূরিত করিয়াছিলেন, যাঁহার প্রভাবে সমস্ত রাজন্যবর্গের গর্ব্ব ও গৌরব খর্ব্ব হইয়াছিল, যিনি নাগেন্দ্রপত্তন প্রভৃতি নানাদেশ জয় করিয়া অত্যন্ত যশস্বী হইয়াছিলেন, যিনি একাম্রকাননে হরিহর ব্রহ্মা সীতা রাম লক্ষ্মণ হনূমান্ প্রভৃতি অষ্টোত্তর শত দেববিগ্রহ এবং চারিদিকে অপূর্ব্ব পতাকা পরিশোভিত, সুরভিকুসুমসমূহাদির সৌন্দর্য্যে নন্দনকানন অপেক্ষা মনোহর অত্যুত্তম আমোদময় উদ্যানসমূহে পরিবেষ্টিত অত্যুচ্চ সুন্দর মন্দির সকল এবং মন্দাকিনীর ন্যায় স্বচ্ছতোয় কমলকহ্লার শোভিত বিস্তৃত সরোবর সকল প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, যিনি নানাশাস্ত্র ও অস্ত্রবিদ্যায় বিলক্ষণ সুদক্ষ, অসাধারণ বালভট্ট, গর্গ, ভট্টাচার্য্য ও বাচস্পতি প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত সাত জন সচিবের সাহায্যে স্বীয় এবং পরকীয় রাষ্ট্রের সর্ব্ব কার্য সুসম্পন্ন করিতেন, যিনি নিজ জননীর কাশীশ্বর বিশ্বেশ্বরের পদারবিন্দ দর্শনে যাইবার অভিপ্রায় অবগত হইয়া, তাঁহার স্বচ্ছন্দ গমনের জন্য একটী প্রশস্ত পথ প্রস্তুত করাইয়া দিয়াছিলেন; অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ প্রভৃতি নানাদেশে যাঁহার অদ্ভুত কর্ম্মকাহিনী বিঘোষিত হইয়াছিল, যিনি ব্রাহ্মণদিগকে ভূসম্পত্তি


  1. “যোগীপাল গোপীপাল মহীপাল গীত।
    ইহা শুনিতে যে লোক আনন্দিত॥” (চৈতন্যভাগবত অন্ত্যখণ্ড)