বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪২২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (বর্ম্মবংশ)
[৪২০]
বঙ্গদেশ (বর্ম্মবংশ)

দান করিয়া অশেষ পুণ্য সঞ্চয় করিয়াছিলেন, সেই রাজাধিরাজ নৃপকুলশিরোমণি রাজাধিরাজ হরিবর্ম্মদেবের জয় হউক।[ব্যাখ্যা ১]

 কবিশেখর প্রাচীন প্রমাণ বলে তিন শত বর্ষ পূর্ব্বে যে সকল কথা লিখিয়া গিয়াছিলেন, তাহার একটীও অত্যুক্তি নহে। একাম্রকানন বা ভুবনেশ্বরের অনন্ত বাসুদেবের মন্দিরে ভবদেবভট্টের যে কুলপ্রশস্তি উৎকীর্ণ আছে, তাহা হইতেও আমরা জানিতে পারি, রাঢ়ী শ্রেণী সিদ্ধল গ্রামীণ অদ্বিতীয় পণ্ডিত ভবদেব ভট্ট বঙ্গাধিপ হরিবর্ম্মদেবের একজন সচিব এবং ভবদেবের কুলপ্রশস্তি-রচয়িতা বাচস্পতিমিশ্র তাঁহার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন।[ব্যাখ্যা ২] অনন্ত বাসুদেবের সুন্দর মন্দির ভবদেবেরই কীর্ত্তি। তিনিও রাঢ়দেশে নানা পথ ও পান্থনিবাস নির্ম্মাণ করাইয়া সাধারণের সমূহ উপকার করিয়া গিয়াছেন। এক জন বাঙ্গালী ব্রাহ্মণের কীর্ত্তি উৎকলে কিরূপে প্রতিষ্ঠিত হইল? এক সময়ে এই সন্দেহ হইয়াছিল। এখন বুঝিতে পারিতেছি যে, উৎকলে হরিবর্ম্মার অধিকার বিস্তৃত হইয়াছিল বলিয়াই তাঁহার প্রিয় মন্ত্রী ভবদেব এখানে দেবকীর্ত্তি রক্ষায় সমর্থ হইয়াছিলেন। ভুবনেশ্বরের বর্ত্তমান বিন্দুহ্রদের অপর পারে বহু মন্দির ধ্বংস অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে, তাহার অধিকাংশ আমরা মহারাজ হরিবর্ম্মদেবের কীর্ত্তি বলিয়া মনে করি। তিনি যে উৎকল ও নাগেন্দ্রপত্তন বা নাগপুর জয় করিয়াছিলেন, তাহাতে আর সন্দেহ করিবার কারণ দেখি না। তৎপূর্ব্বে বঙ্গে ও উত্তর রাঢ়ে বৌদ্ধ-


  1. “স্বস্তি সমস্ত নরপতিকুলললাম প্রোদ্দণ্ড ভুজদণ্ডসম্মণ্ডিত-বিকরালকরবালভয়-প্রকম্পিতদক্ষিণাপথাগতাশেষরিপুরাজন্যজৈন-বৌদ্ধাদি-বিধর্ম্মি-শর্ম্ম-সম্মর্দ্দন-খর্ব্বীকৃত-সর্ব্বোর্ব্বীপতি-গর্ব্বগৌরবো নাগেন্দ্রপত্তনাদ্যনেকদেশবিজয়লব্ধোদ্দামজয়শ্রীরেকাম্রকাননপ্রতিষ্ঠাপিত-হরিহর-বিরিঞ্চিবৈদেহীরাঘবলক্ষ্মণ-হনূমদাদ্যষ্টোত্তরশতাদ্ভুত-বৈজয়ন্তীবিভাসিতামন্দগন্ধ প্রসূ প্রসূনপটলসৌন্দর্য্যাদিন্যক্কৃত-নন্দনকাননবৈভবপরমামোদময়োদ্যানসমলঙ্কৃতসুরপথসংস্পর্শি সুন্দরমন্দির-মন্দাকিনী-বিমলকীলালকমলকহ্লারেন্দীবরশোণারবিন্দবৃন্দসংশোভিতসুবিশালসরোবরসংহতিঃ…দেশনিবাসনিখিলশাস্ত্রাস্ত্রনিপুণপরিজ্ঞানলদ্ধানন্যবৈচক্ষণ্য-বালভট্ট-ভট্টাচার্য্যগর্গবাচস্পতিপ্রমুখ-বিশ্ব-বিখ্যাত সপ্তসচিব সাহচর্য্যনির্ব্বর্ত্তিত-সম্যক্‌ স্বপররাষ্ট্রসর্ব্বব্যাপারো বারাণসীশ্বরবিশ্বেশ্বরপদারবিন্দসন্দর্শনার্থসমুদ্যত স্বজননী-স্বচ্ছন্দেপরিচারকৃতে প্রবর্ত্তিতপ্রশস্তবর্ত্মাসদনুমতপ্রতিনিয়তসন্নীতি পরিসেবনসম্প্রাপ্তপরমশর্ম্মা বঙ্গাঙ্গকলিঙ্গাদ্যশেষজনপদবহুমতাদ্ভুতকর্ম্মা দয়ার্দ্রচেতা ভূদেবভূদানার্জ্জিতাশেষধর্ম্মা জয়তাচ্চিরং রাজাধিরাজো দেব শ্রীহরিবর্ম্মা।” (রাঘবেন্দ্র কবিশেখর)
  2. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ১ মাংশে ভবদেবভট্টের কুলপ্রশস্তি দ্রষ্টব্য।
প্রভাব এবং জৈন নরপতি বিজয়ী রাজেন্দ্রচোলের সহিত অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গে জৈন প্রভাবও বিস্তৃত হইয়াছিল;—মহাবীর হরিবর্ম্মদেব সেই সকল বৌদ্ধ, জৈন প্রভাব খর্ব্ব করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কবিশেখর হরিবর্ম্মদেবের সপ্ত সচিবের মধ্যে যে বালভট্ট ও বাচস্পতির কথা লিখিয়াছেন, অনন্তবাসুদেবের মন্দিরস্থ কুলপ্রশস্তি হইতে ঐ দুই প্রধান সচিবের নাম বাহির হইয়াছে। বালভট্ট কুলপ্রশস্তিতে “বালবলভী ভুজঙ্গ ভবদেব ভট্ট” নামে খ্যাত। পরম বৈষ্ণব মহারাজ হরিবর্ম্মদেব গৌড়, বঙ্গ ও রাঢ়দেশে বিশুদ্ধ বৈদিকাচার প্রবর্ত্তনের জন্য যত্নবান্ হইয়াছিলেন। ফরিদপুর জেলাস্থ সামন্তসার হইতে আবিষ্কৃত হরিবর্ম্মদেবের তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে, তিনি বেদার্থবাচক ঋগ্বেদী বৎস গোত্রজ কৃষ্ণধর ভট্টারককে (ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত) বেজণিসার প্রভৃতি গ্রাম দান করিয়াছিলেন।[ব্যাখ্যা ১] এইরূপে তিনি বৈদিক বিপ্রতিলক শুনক যশোধর মিশ্রকে কোটালিপাড় দান এবং অপরাপর বৈদিক ব্রাহ্মণকেও সম্মানিত করিয়া বৈদিকাচার-প্রচারে উৎসাহ দান করিয়াছিলেন। এই সময়ে সর্ব্ব শাস্ত্রদর্শী মন্ত্রিবর ভবদেব ভট্ট রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে বিশুদ্ধ বৈদিকাচার প্রবর্ত্তন করিবার অভিপ্রায়ে “সামবেদীয় সংস্কারপদ্ধতি” রচনা করেন। অদ্যাপি সেই পদ্ধতি অনুসারেই রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণগণের সংস্কারাদি সম্পন্ন হইয়া থাকে।

 ভবদেব ভট্ট যেমন এক জন অসাধারণ মীমাংসক ছিলেন, তাঁহার বন্ধু বঙ্গাধিপের প্রধান মন্ত্রী বাচস্পতি মিশ্রও সেইরূপ এক জন সর্ব্বদর্শনবিদ্ অসাধারণ নৈয়ায়িক ছিলেন। তাঁহার ষড়্দর্শন টীকা ও ন্যায়সূচীনিবন্ধ সংস্কৃত সাহিত্য-ভাণ্ডারের অপূর্ব্ব রত্ন। তাঁহার ন্যায়সূচীনিবন্ধে লিখিত আছে যে, এই গ্রন্থ “বস্বঙ্ক বসু বৎসরে” অর্থাৎ ৮৯৮ শকে (৯৭৬ খৃষ্টাব্দে) রচিত হয়। ইহাই তাঁহার প্রথম রচনা বলিয়া অনেকে অনুমান করেন। ইহার পর তিনি মিথিলার রাজসভায় সম্মানিত হন এবং তথায় ষড়্দর্শনের টীকা রচনা করেন। পালরাজগণের প্রভাবে মিথিলায় বৌদ্ধাচার প্রবল হইলে বাচস্পতি মিশ্র ব্রাহ্মণভক্ত দক্ষিণরাঢ়ের সভায় আগমন করেন। জৈনধর্ম্মাবলম্বী রাজেন্দ্রচোলের আক্রমণে রণশূর রাজ্যভ্রষ্ট হইলে বাচস্পতি মিশ্রও তীর্থবাস করিবার জন্য উৎকল যাত্রা করেন। ঐ সময়ে হরিবর্ম্মদেবের অভ্যুদয়। তিনি বাচস্পতি মিশ্রের অসাধারণ পাণ্ডিত্যদর্শনে তাঁহাকেই আপনার প্রধান মন্ত্রিত্ব প্রদান করেন।

 রাঘবেন্দ্র কবিশেখর লিথিয়াছেন যে, কান্যকুব্জে যবনাগম


  1. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ৩য়াংশে হরিবর্ম্মদেবের তাম্রশাসন দেখ।