বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪২৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (সেনবংশ)
[৪২১]
বঙ্গদেশ (সেনবংশ)

ও রাজ্যনাশ দেখিয়া গঙ্গাগতি প্রভৃতি বহু বৈদিক ব্রাহ্মণ জন্মভূমি পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।[ব্যাখ্যা ১] এই সময়ে গৌতমগোত্রীয় গঙ্গাগতি প্রভৃতি কএকজন বৈদিক ব্রাহ্মণ বঙ্গে হরিবর্ম্মরাজের রাজধানীতে আগমন করেন।[ব্যাখ্যা ২] তাঁহারা কোটালিপাড়ে বাস করিতে থাকেন।

 মুসলমান ইতিহাস হইতে আমরা জানিতে পারি যে, দেবদ্বেষী সুলতান মাহ্মূদ ১০১৯ খৃষ্টাব্দে বা ৯৪৩ শকে কনোজজয়ে অগ্রসর হইয়াছিলেন। তাঁহার আক্রমণে কনোজরাজ্য শ্রীহীন হইয়া পড়িয়াছিল। ঐ সময়ে বৈদিকবিপ্রগণের মধ্যে কেহ কেহ নিরাপদ হইবার আশায় দেববিপ্রভক্ত বঙ্গাধিপ হরিবর্ম্মদেবের অধিকারে বাসস্থাপন করিয়াছিলেন। তাঁহাদের পদার্পণে বঙ্গদেশে বৈদিকাচার প্রতিপালনের যথেষ্ট সুবিধা হইয়াছিল। সম্ভবতঃ ১০১৯ খৃষ্টাব্দেরও পূর্ব্বে হরিবর্ম্মদেবের অভ্যুদয় ঘটে। ১০১১ কি ১২ খৃষ্টাব্দে গোবিন্দচন্দ্র রাজেন্দ্রচোলের নিকট পরাজিত হইলে এবং বিজেতা বঙ্গরাজ্য পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলে হরিবর্ম্মের পিতা জ্যোতির্বর্ম্মদেব বঙ্গ অধিকার করেন। তিনি বেশী দিন রাজ্যভোগ করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না। তৎপুত্র হরিবর্ম্মদেব রাঢ়, বঙ্গ ও কলিঙ্গ জয় করিয়া প্রায় ১০১৫ খৃষ্টাব্দে এক জন মহারাজাধিরাজ বলিয়া খ্যাত হইয়াছিলেন। ইঁহার ৪২ রাজ্যাঙ্কিত তাম্রশাসন পাওয়া গিয়াছে। এতদ্দ্বারা মনে হয় যে, প্রায় ১০৫৬ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত তিনি রাজত্ব করেন।


সেনরাজবংশ।

 মহারাজ হরিবর্ম্মদেবের প্রভাব গঙ্গার উত্তরতীরে বিস্তৃত হয় নাই। উত্তররাঢ় ও গঙ্গার পরপারস্থ বরেন্দ্র হইতে গয়া পর্য্যন্ত তখনও বৌদ্ধাধিকার চলিতেছিল। রাজেন্দ্রচোলের রাঢ়দেশ আক্রমণকালে দক্ষিণাপথের বহু সামন্ত নৃপতি তাঁহার বলবৃদ্ধি করিয়াছিলেন। রাজেন্দ্রচোলের প্রত্যাবর্ত্তনকালে সকল সামন্তই যে তাঁহার অনুগামী হইয়াছিলেন, এমন বোধ হয় না। তন্মধ্যে সামন্তসেনের নাম শিলালিপি ও তাম্রশাসন হইতে বাহির হইয়াছে। মহারাজ হরিবর্ম্মদেবের অভ্যুদয়কালে দাক্ষিণাত্যরাজবংশীয় সামন্তসেন সম্ভবতঃ তাঁহারই অধীন সামন্তরূপে ভাগীরথীতীরে
  1. “রাজ্যপ্রণাশং যবনাগমঞ্চ দাবানলং দস্যুভয়ং বিভাব্য। 
    এতদ্ধি যুক্তং ধনধর্ম্মদেহপ্রাণাদিরক্ষার্থমিতঃ প্রয়াণম্॥”
    (রাঘবেন্দ্র কবিশেখর)
  2. “ততোঽভ্যগচ্ছৎ কিল রাজধানীমনন্তরং শ্রীহরিবর্ম্মরাজ্ঞঃ। 
    বাচস্পতিস্তস্য সভাপতির্যস্তেনৈব রাজ্ঞো ভবনং বিবেশ॥
    তমাশিষা ভূপতিং বর্দ্ধয়িত্বা তত্র স্থিতৈর্বাড়বৈর্বন্দিতোঽসৌ।
    মিশ্রেণ বাচস্পতিনা সমেত্য পরস্পরং ক্ষেমমথাবভাবে॥”

    বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ৩য় অংশ ৬৷৷৴৹ পৃষ্ঠা।
তীর্থবাস করিতে থাকেন। তাঁহারই পুত্র হেমন্তসেন। ঈশ্বর বৈদিকের প্রাচীন বৈদিককুলপঞ্জীর মতে, হেমন্ত ওরফে ত্রিবিক্রম প্রথমে স্বর্ণরেখা নদীতীরে কাশীপুরী[ব্যাখ্যা ১] নামক স্থানে রাজত্ব করিতেন।[ব্যাখ্যা ২] রাঢ়ীয় কুলপঞ্জী মতে, সামন্ত বা হেমন্তসেন দক্ষিণরাঢ়ের শূরবংশীয় নৃপতির কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। শূররাজ নিজ বংশ ধ্বংস করিয়া স্বর্গ গমন করিলে রাজ্যে অরাজকতা ঘটে, এই সময় হেমন্তসেন শূররাজ্য অধিকার করিয়া “শ্রীধর” নাম গ্রহণপূর্ব্বক ৩৪ বর্ষ রাজত্ব করেন।[ব্যাখ্যা ৩] কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, এই অরাজকতা শূরবংশের রাজ্যহানির জন্য ঘটে নাই, কারণ রণশূরের পরও যে এই রাজবংশ এক কালে বিলুপ্ত হয় নাই, সে কথা পূর্ব্বেই লিখিয়াছি। অধিক সম্ভব, মহারাজ হরিবর্ম্মদেবের মৃত্যুতে সমস্ত রাঢ়বঙ্গে অরাজকতা ঘটে, এই সুযোগে হেমন্তসেন রাঢ়দেশ অধিকার করিয়া বসেন। কিন্তু সমতট বা পূর্ব্ববঙ্গের উত্তরাংশ পাল রাজাদিগের অধিকারে এবং দক্ষিণাংশ রাজা হরিবর্ম্মের পুত্রের অধিকারে থাকে। হেমন্তসেনের অসাধারণ বীরত্ব, অপূর্ব্ব সাহস ও তদ্দ্বারা নৃপালবর্গের পরাজয়কাহিনী মহাকবি উমাপতিধরের উজ্জ্বল ভাষায় চিত্রিত হইয়াছে।

 তাঁহার অভ্যুদয়ের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত উত্তররাঢ়ে বৌদ্ধ পালনরপতিগণের রাজধানী ছিল। কিন্তু তাঁহার আক্রমণ সহ্য করিতে না পারিয়া মহীপালপুত্ত্র নয়পাল প্রায় ৯৬৫ শকে (১০৪৩ খৃষ্টাব্দে) বিক্রমশিলায়[ব্যাখ্যা ৪] রাজধানী স্থানান্তরিত করিয়াছিলেন। পূর্ব্বেই লিখিয়াছি, রাঢ়ীয়কুলপঞ্জী মতে হেমন্তসেন ৩৪ বর্ষ রাজস্ব করেন। এ দিকে বিক্রমপুরের বৈদিককুলপঞ্জী মতে, হেমন্ত-ত্রিবিক্রমের পৌত্র ও বিজয়ের পুত্র শ্যামলবর্ম্মা বিক্রমপুর অধিকার করিয়া ৯৯৪ শকে (১০৭২ খৃষ্টাব্দে) রাজ্যে অভিষিক্ত হন।[ব্যাখ্যা ৫] এরূপ স্থলে ৯৯৪ শকের পূর্ব্বে হেমন্তপুত্র বিজয়সেনের রাজ্যলাভ, এবং তাঁহার ৩৪ বর্ষ পূর্ব্বে হেমন্তসেনের অভিষেক হইয়াছিল, বলিতে হয়।

 বিজয়সেন প্রায় ৯৯০ শকে পিতৃরাজ্য লাভ করেন। দেওপাড়া হইতে আবিষ্কৃত বিজয়সেনের শিলালিপিতে লিখিত আছে যে, তিনি মিথিলা হইতে কামরূপ এবং দক্ষিণে কলিঙ্গ পর্য্যন্ত আপনার অধিকারভুক্ত করিয়াছিলেন। “বল্লালোদয়” নামক


  1. বর্ত্তমান নাম কাশীয়াড়ী।
  2. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ৩য় অংশ ১৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
  3. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (ব্রাহ্মণকাণ্ড) ৩য় অংশ ১৯ পৃষ্ঠা ও ৬ষ্ঠ অংশ ২৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
  4. বেহারস্থ বর্ত্তমান শিলাও নামক গ্রাম।
  5. “বেদগ্রহগ্রহমিতে স বভূব রাজা গৌড়ে স্বয়ং নিজবলৈঃ পরিভূয় শত্রূন্। 
    শূরান্বয়ানতিমদান্ বিজিতান্তরাত্মা শাকে পুনঃ শুভতিথৌ বিজয়স্য সূনুঃ॥”
    (বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ব্রাহ্মণকাণ্ড, ৩য় অংশ ১৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)