কুলীন গুরুর শ্রেষ্ঠতা প্রচার করেন। ক্রমে বল্লাল-পূজিত কুলীনগণই গৌড়-বঙ্গের বিস্তৃত শাক্তসমাজের মন্ত্রগুরু হইয়া পড়িলেন। বল্লালসেন তাঁহাদের স্বাতন্ত্র্য ও পদমর্য্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য তাঁহাদের স্ব স্ব কর্ত্তব্য ও তাঁহাদের মধ্যে পরিবর্ত্ত মর্য্যাদা প্রচলন করিলেন।
কিন্তু বয়োবৃদ্ধি ও শাস্ত্রালোচনার সঙ্গে গৌড়াধিপেরও বৈদিক ধর্ম্মের উপর আস্থা বর্দ্ধিত হয়, তাহা তাঁহার মৃত্যুর কিছু পূর্ব্বে রচিত “দানসাগর” পাঠ করিলে কতকটা আভাস পাওয়া যায়। মৃত্যুর পূর্ব্বে তিনি প্রিয় পুত্র লক্ষ্মণকে আহ্বান করিয়া তৎপ্রবর্ত্তিত কুলবিধিপালন এবং সময়োপযোগী বৈদিকমিশ্রিত তান্ত্রিকমার্গ প্রচারের উপদেশ দিয়া যান।
১১৭০ খৃষ্টাব্দে রাজা লক্ষ্মণসেন পিতৃসিংহাসনে অধিরোহণ ফরেন। লক্ষ্মণসেনের পূর্ব্ব হইতেই তান্ত্রিক ধর্ম্মে সেরূপ অনুরাগ ছিল না, তাঁহার পিতামহাদির মত তিনিও বৈদিক কর্ম্মানুষ্ঠানে তৎপর এবং বৈদিক বিপ্রে অনুরক্ত ছিলেন। তাঁহার প্রধান মন্ত্রী পশুপতি এবং তাঁহার প্রধান ধর্ম্মাধিকারী (Chief-justice) হলায়ুধ বৈদিক ব্রাহ্মণ। তাঁহার যে কয়খানি তাম্রশাসন পাওয়া গিয়াছে, তাহা শ্রুতিশাস্ত্রবিৎ বৈদিকবিপ্রগণের উদ্দেশ্যেই নিবদ্ধ, রাঢ়ীয় বা বারেন্দ্র বিপ্রগণের উদ্দেশে প্রদত্ত তাঁহার কোন তাম্রশাসনই পাওয়া যায় নাই।
সিংহাসনারোহণের কিছুকাল পরে লক্ষ্মণসেন পিতার আদেশ প্রতিপালন করিবার জন্যই পিতৃপূজিত কুলীনদিগকে সভায় আহ্বান করিয়া তাঁহাদের সমীকরণ করিলেন এবং হলায়ুধ ও পশুপতির সাহায্যে অতি প্রচ্ছন্নভাবে সমাজসংস্কারে অগ্রসর হইলেন। সে সময়ে সমস্ত গৌড়বঙ্গ তান্ত্রিকতায় আচ্ছন্ন। সাধারণে তন্ত্র ব্যতীত অপর কোন শাস্ত্র প্রমাণ্য বলিয়া মনে করিতেন না। সুতরাং লক্ষ্মণসেনকেও তন্ত্রের আশ্রয় লইতে হইল। তাঁহার প্রধান ধর্ম্মাধিকারী পরম পণ্ডিত হলায়ুধ শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ ও তন্ত্রের সারসংগ্রহপূর্ব্বক সেই সময়ের উপযোগী ‘মৎস্যসূক্ত’ নামে এক মহাতন্ত্র প্রচার করিলেন। হিন্দু সমাজের সদাচার রক্ষা হয়, অথচ সাধারণ তান্ত্রিকগণ বিরোধী না হয়, যেন এই মহদভিপ্রায়েই মৎস্যসূক্ত তন্ত্র রচিত হইয়াছে। প্রথমেই মৎস্যসূক্ততন্ত্রে বীরাচারীদিগের অভিমত তারাকল্প, একজটা, উগ্রতারা এবং ত্রিপুরা দেবীর পূজাক্রম ও মন্ত্রোদ্ধার, তৎপরে বৌদ্ধতন্ত্রানুমোদিত মহাচীনক্রম, তারার বীরসাধন ও নীলসারস্বতক্রম এবং মধ্যে মধ্যে বেদের প্রশংসা করিয়া যেন বৌদ্ধতন্ত্রানুসারেই তারার স্তব করা হইয়াছে। প্রথমাংশ পাঠ করিলে মৎস্যসূক্ত যেন বীরাচারীর প্রিয় বস্তু বলিয়া মনে হইবে। কিন্তু বীরাচার সমর্থন করা মৎস্যসূক্ত-মহারাজ লক্ষ্মণসেন একদিকে যেমন মৎস্যসূক্ততন্ত্র প্রচার করাইয়া সাধারণ তান্ত্রিকগণের কদাচারবর্জ্জনের উপায় করিলেন, অপরদিকে আবার বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণের জন্য প্রধান মন্ত্রী পশুপতি দ্বারা “সংস্কারপদ্ধতি” এবং রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র বিপ্রসমাজের ব্রাহ্মণত্ব রক্ষা করিবার জন্য “ব্রাহ্মণসর্ব্বস্ব” প্রচার করাইলেন। এই সময়েই হলায়ুধের অপর ভ্রাতা পণ্ডিতবর ঈশান গৌড়বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ-সমাজের জন্য “আহ্নিকপদ্ধতি” প্রচার করেন। মহারাজ লক্ষ্মণসেন কিরূপে বঙ্গের হিন্দু সমাজকে উন্নত করিবার জন্য যত্নবান্ হইয়াছিলেন, তাহা উক্ত চারিখানি গ্রন্থ পাঠ করিলে অনায়াসেই হৃদয়ঙ্গম হহবে। বিশেষতঃ মৎস্যসূক্ত আলোচনা করিলে মনে হইবে যে, লক্ষ্মণসেন যে প্রণালী অবলম্বন করিয়াছিলেন, প্রায় সেই প্রণালীতেই বঙ্গীয় হিন্দুসমাজ আজও পরিচালিত হইতেছে।
মহারাজ লক্ষ্মণসেন বৃদ্ধ বয়সে গোঁড়া বৈষ্ণব হইয়া পড়িয়াছিলেন। জয়দেবের কোমলকান্তপদাবলির মধুর আস্বাদনেই তিনি অনেক সময় অতিবাহিত করিতে লাগিলেন। প্রথমে যে হলায়ুধ “শৈবসর্ব্বস্ব” লিখিয়া গৌড়রাজের প্রীতিভাজন হইয়াছিলেন, এখন তাঁহাকেই “বৈষ্ণবসর্ব্বস্ব” লিখিতে হইল। ভাগবতধর্ম্মের গূঢ় রহস্য সাধারণের সহজবোধ্য নহে। সাধারণের পক্ষে তাহার বিপরীত ফল উৎপাদন করিয়াছিল। এই সময়ের রাজকবি ধোয়ীর “পবনদূত” পাঠ করিলে দেখা যায়, বৃদ্ধ লক্ষ্মণসেনের রাজধানীতে বিলাসিতার স্রোত প্রবাহিত হইতেছিল,—প্রকাশ্য রাজপথ বারবিলাসিনীগণের মঞ্জিরনিক্কণে