বাঙ্গালা রাজ্যের পশ্চিম অংশ হস্তচ্যুত হওয়ার বহুদিন পর পর্য্যন্তও হিন্দুরাজগণ পূর্ব্ব-বাঙ্গালার সোণারগাঁও প্রভৃতি স্থানে রাজত্ব করিয়াছিলেন। কিন্তু ১২০৯ খৃঃ অব্দের পূর্ব্ব হইতেই সোণারগাঁও নগরে মুসলমানগণের সমাগম ঘটিয়াছিল। খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতেও বসোরার আরব সওদাগরগণ ভারতবর্ষ ও চীনের সহিত বহুল পরিমাণে সামুদ্রিক বাণিজ্যে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁহারা যে সকল দেশে পরিভ্রমণ করিতেন, তথায় এক একটী বাণিজ্যাবাস স্থির করিয়া যান। বাঙ্গালার বাণিজ্যপ্রাধান্য হইতে আমরা বেশ বুঝিতে পারি যে, অতি পূর্ব্বকাল হইতে বাঙ্গালায় মুসলমানদের উপনিবেশ স্থাপন করার সুযোগ ঘটিয়াছিল। প্রাচীনকালে পশ্চিম জগতের সহিত এ দেশের যেরূপ বহুল পরিমাণে বাণিজ্যাদি চলিত, খৃষ্টীয় ৯ম শতাব্দে লিখিত দুই জন মুসলমান পরিব্রাজকের ভ্রমণবৃত্তান্তে তাহার সবিশেষ উল্লেখ আছে। তাঁহারা “এ দেশকে রামি রাজার দেশ বলিয়া” উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন! আরও বলিয়াছেন—“তাঁহার অসংখ্য হস্তী আছে। বাঙ্গালার প্রধান রপ্তানি দ্রব্য সূক্ষ্ম তূলার কাপড় (ঢাকাই মস্লিন?), অগুরু চন্দন, এক প্রকার চর্ম্ম, গণ্ডারের খড়্গ ইত্যাদি। এই সকলই কড়ি বিনিময়ে ক্রয় করা যায়। কড়িই এ দেশের প্রচলিত মুদ্রা।”
মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্ত।
(প্রথম শাসনকাল।)
[লক্ষ্মণসেন দেখ।]
বরেন্দ্র এবং রাঢ় ১২০৩ খৃঃ অব্দে মুসলমান শাসনাধীন হইলেও, প্রকৃত বঙ্গদেশ বা বাঙ্গালার পূর্ব্বাংশ মহম্মদ তোগ্লক শাহের রাজত্বকালে মুসলমানকর্ত্তৃক ১৩৩০ খৃঃ অব্দে অধিকৃত হয়। গৌড়, সপ্তগ্রাম এবং সুবর্ণগ্রাম নগর বা বন্দরে উক্ত সম্রাটের প্রতিনিধিগণ রাজধানী স্থাপন করিয়া রাজকার্য্য নির্ব্বাহ করিয়াছিলেন।
মহম্মদ্-ই-বখ্তিয়ার খিলজী হইতে আরম্ভ করিয়া কাদর খাঁর শাসন সময় পর্য্যন্ত বাঙ্গালা দিল্লী-সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তৎকালে দাস, খিলজী ও তোগলক বংশীয় দিল্লীশ্বরগণ আপন আপন প্রতিনিধি দ্বারা বাঙ্গালা শাসন করিতেন। কিন্তু সুলতান ফখ্র উদ্দীনের রাজত্ব সময়ে বাঙ্গালা দিল্লীর অধীনতা উন্মোচন করিয়া স্বাধীন হইল (১৩৪০ খৃঃ অঃ)। তিনি বাঙ্গালা রাজ্যের সমগ্র শাসনশক্তি স্বহস্তে গ্রহণ করিয়া আপনাকে স্বাধীন বাদশাহ বলিয়া ঘোষণা করেন। যতদিন না অকবর বাদশাহ দায়ুদকে পরাজিত করিয়া খৃষ্টীয় ১৫৭৬ অব্দে বাঙ্গালার স্বাধীনতা হরণ করিয়াছিলেন, ততদিন বাঙ্গালা পাঠানজাতির অক্ষুণ্ণ প্রতাপ ও অপরিসীম অত্যাচার অকুণ্ঠিত চিত্তে সহ্য করিতে বাধ্য হইয়াছিল। কবিকাহিনীতে তাহা বিশেষরূপে বিবৃত আছে।[ব্যাখ্যা ১]
মহম্মদ্-ই-বখতিয়ার স্বীয় অধিকৃত বাঙ্গালা প্রদেশ দুই খণ্ডে বিভক্ত করিয়াছিলেন। বরেন্দ্রভূমি ও বগড়ীর কিয়দংশ লইয়া যে বিভাগ গঠিত হয়, দিনাজপুরের নিকটবর্ত্তী দেবকোট নামক স্থানে তাঁহার রাজধানী ছিল। অপর বিভাগের রাজধানী গৌড় বা লক্ষ্মণাবতী। রাঢ় ও মিথিলার কিয়দংশ তাহার অন্তর্ভুক্ত। মুসলমানপতি উত্তর-প্রদেশবাসী হিন্দুরাজগণের আক্রমণ হইতে স্বাধিকৃত গৌড়রাজ্যরক্ষার জন্য রঙ্গপুরে দুর্গ নির্ম্মাণ করাইয়াছিলেন। অতঃপর কামরূপ ও তিব্বত অধিকারে মানস করিয়া তিনি কামাতপুর-রাজের সহিত সন্ধিস্থাপন করেন; কিন্তু কামরূপসেনার পরাক্রমে পাঠানসৈন্য সমূলে বিনষ্ট হয়। যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করিয়া মহম্মদ্-ই-বখ্তিয়ার দেবকোটে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন, তথায় বলক্ষয়ে ও চিন্তাজনিত জ্বরে অল্পদিনের মধ্যেই
- ↑ বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ব্রাহ্মণকাণ্ড, ১ম অংশ দ্রষ্টব্য।