হইতে পারিল না; সুতরাং অন্যপথে গমনের আশাও রহিল না। তখন সম্রাট্ বাধ্য হইয়া সন্ধির প্রস্তাবসহ পাঠানশিবিরে দূত পাঠাইলেন। শের খাঁর ধর্ম্মগুরু পবিত্র ধার্ম্মিক দরবেশ খলিল মধ্যস্থ হইলেন। সন্ধিপত্রে স্থির হইল, সম্রাট্ শের খাঁকে বাঙ্গালা ও বিহার ছাড়িয়া দিবেন। পক্ষান্তরে শের খাঁও কখন সম্রাটের গতিরোধ বা তাঁহার শত্রুকে সাহায্য করিতে পারিবেন না। সন্ধির পর উভয় শিবিরে আনন্দস্রোত প্রবাহিত হইল। মোগলগণ বাঙ্গালায় আসিয়া নানা কষ্টের পর আজ আহ্লাদ-সাগরে ভাসমান হইয়া সমস্ত বিপদের আশঙ্কাই ভুলিয়া গিয়াছিল; কিন্তু বিশ্বাসঘাতক শের খাঁ শত্রুর প্রতিজিঘাংসা ভুলেন নাই। যে দিন সম্রাট্ সমক্ষে সে কোরাণস্পর্শে শপথ করিল, সেই দিনে রজনীর গাঢ় অন্ধকারে অতর্কিতভাবে সেই আফগানদস্যু মোগল শিবির আক্রমণ করিলেন। মোগল সৈন্য দলে দলে আহত, নিহত ও পলায়নপর হইল। সম্রাট্ প্রাণ লইয়া অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণপূর্ব্বক গঙ্গা পার হইলেন, কিন্তু তাঁহার অধীনস্থ আট সহস্র মোগল সৈন্য নদীস্রোতে ভাসিয়া গেল (১৫৩৯ খৃঃ অঃ)।
হুমায়ুনের পরাজয়ে বাঙ্গালায় সূরবংশীয় আফগানগণের প্রতিষ্ঠা হইল। তাঁহার অভ্যুদয়ে তৎকালে সমগ্র উত্তর ভারত প্রকম্পিত হইয়াছিল। কোন্ সূত্রে শের খাঁ বেহার-রাজসরকারে নিযুক্ত হইয়া কিরূপ প্রতিভাবলে বঙ্গ ও বেহারের অধীশ্বর হইয়াছিলেন, তাহা পূর্ব্বে বর্ণিত হইয়াছে।
তিনি রোহ্বাসী সূরবংশীয় আফগান। তাহার পিতার নাম হুসেন। তিনি স্বীয় পুত্রের নাম ফরিদ রাখেন। এই কারণে শের খাঁ রাজাসনে আসীন হইয়া ফরিদ্উদ্দীন্ শের শাহ নাম ধারণ করিয়াছিলেন। সুলতান বহলোল লোদীর রাজ্যকালে তাঁহার পিতামহ ইব্রাহিম জন্মভূমি পরিত্যাগপূর্ব্বক দিল্লী রাজধানীতে উপনীত হন এবং সামরিক বিভাগে কর্ম্ম গ্রহণ করিয়া স্বীয় সৌভাগ্যান্বেষণে প্রয়াস পান।
বহলোল-পুত্র সিকন্দর লোদীর শাসন কালে জৌনপুরের শাসনকর্ত্তা সর্দ্দার জয়মল্ল ইব্রাহিম-পুত্র হুসেনকে সঙ্গে আনেন। হুসেনের রণপাণ্ডিত্য ও সদ্গুণাদি লক্ষ্য করিয়া জয়মল্ল তাঁহাকে সাসেরাম ও তাঁড়া জেলা জায়গীরস্বরূপ দান করেন। তাহার আয় হইতে ৫ শত অশ্বারোহী সেনাদল রক্ষা করিয়া হুসেন রাজার অধীন সামন্তরূপে পরিগণিত হন।
হুমায়ুনের পাঠান জাতীয় পত্নীর গর্ভে ফরিদ ও নিজামের জন্ম হয়। পিতা পুত্রের বিদ্যা শিক্ষা বিষয়ে বিশেষ যত্ন লইতেন না বলিয়া ফরিদ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া জয়মল্লের অধীনে সৈনিকবৃত্তি অবলম্বন করেন। এই সামরিক শিক্ষাকালে তিনিতিন চারি বৎসর পরে হুসেন জৌনপুরে আসিয়া পুত্রের বিদ্যাবত্তার পরিচয় পাইলেন। তিনি তখন উপযুক্ত পুত্র হস্তে স্বীয় সম্পত্তির পরিচালন ভার সমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হন। ইহাতে তাঁহার বিমাতা ও বৈমাত্রেয় ভ্রাতা সুলেমানের ঈর্ষা বৃদ্ধি হয়। বিমাতার পীড়নে পিতার মানসিক বিপর্য্যয় লক্ষ্য করিয়া আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করেন। এখানে তিনি ইব্রাহিম বাদশাহের প্রসিদ্ধ ওমরাহ দৌলতের সাহায্যে সম্রাটের অনুগ্রহভাজন হন এবং স্বীয় পিতার মৃত্যুর পর পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন।
৯৩২ হিজিরায় সম্রাট্ ইব্রাহিমের পরাজয় সংবাদে, দিল্লীশ্বরের অধীনস্থ সামন্তবর্গ স্ব স্ব প্রাধান্য স্থাপন করিতে উদ্যুক্ত হইলেন। শেরও সে সুযোগ ছাড়িলেন না। তিনি দরিয়া লোহানীর পুত্র পার খাঁর সহিত যোগদান করিয়া বেহার অধিকার করিলেন। পার খাঁ সুলতান মাহ্মূদ লোহানী নাম গ্রহণ করিয়া রাজা হইলেন। এক দিন মাহ্মূদের সহিত শের শীকারে বহির্গত হইয়া স্বহস্তে একটী বৃহদাকার ব্যাঘ্র বধ করেন। সুলতান তাহাতে প্রীত হইয়া তাঁহাকে সের আখ্যা দিয়াছিলেন। পরে তিনি পাঠানবংশীয় চুনারপতি তাজিরের বিধবা পত্নীকে বিবাহ করিয়া চুনার দুর্গ হস্তগত করেন।
শের মাহ্মূদের নিকট বিলক্ষণ প্রতিপত্তিলাভ করিয়াছিলেন; এ জন্য মাহ্মূদের মৃত্যু হইলে যুবরাজ জলাল অপ্রাপ্তবয়স্ক বলিয়া শের বেহারের রাজপ্রতিনিধি হন। কিছুদিন পরে লোহানি সর্দ্দারেরা শেরের বিনাশার্থ একটা ষড়যন্ত্র করে, এবং ইহা প্রকাশ হইয়া পড়িলে, জলাল স্বপক্ষ ওমরাহগণসহ বাঙ্গালায় ১৫৩৫-৬ খৃষ্টাব্দে পলাইয়া যান ও বঙ্গেশ্বর মাহ্মূদ শাহের সাহায্য প্রার্থনা করেন। এইরূপে শের বেহারের সর্ব্বময় কর্ত্তা হইয়া উঠেন। অনন্তর তিনি মাহ্মূদ শাহকে গৌড় হইতে তাড়াইয়া দেন, এবং ছলে ভুলাইয়া ও বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ব্বক রাজা বরকেশের নিকট হইতে দুর্ভেদ্য “রোহিতাস্ দুর্গ” অধিকার করিয়া সেখানে স্বীয় পরিবার ও ধনরাশি নিরাপদে রাখিবার উপায় করেন।
রাজ্যচ্যুত মাহ্মূদ শাহ দিল্লীশ্বর হুমায়ুনের শরণাপন্ন হইলে, হুমায়ুন বাঙ্গালা আক্রমণ ও গৌড় নগর অধিকার করেন। শের পশ্চিমাভিমুখে যাইয়া বারাণসী হস্তগত এবং বাঙ্গালা হইতে হুমায়ুনের প্রত্যাগমনের পথ রুদ্ধ করিলেন। যখন হুমায়ুন দিল্লীতে ফিরিয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছেন, তখন গঙ্গা ও কর্ম্মনাশার সঙ্গমস্থলের নিকটে শেরের সৈন্যের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। উভয় দলই শিবির সন্নিবেশ করিয়া