বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪৫০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (মোগল-শাসন)
[৪৪৮]
বঙ্গদেশ (মোগল-শাসন)

 এই বিপদের দিনে, সম্রাট্ অক্‌বর শাহ বহুসৈন্য এবং শাসনকর্ত্তা, জায়গীরদার ও জমিদারদিগের প্রতি আদেশ দিয়া রাজা টোডরমল্লকে বাঙ্গালা ও বেহারের শাসনকর্ত্তা করিয়া পাঠাইলেন। তখন বাঙ্গালা ও বেহার বিদ্রোহি-শত্রুসঙ্কুল। বিদ্রোহিদল বাঙ্গালার মোগলাধিকার উৎসন্ন করিতে যত্নশীল। কাজেই হিন্দুরাজগণ হিন্দুর পক্ষাবলম্বন করিলেন। টোডরমল্ল হিন্দু জমিদারদিগকে হস্তগত করিয়া তাঁহাদের সাহায্যে বিদ্রোহীদিগের রসদ বন্ধ করিয়া দিলেন। পরে তিনি মুঙ্গের ও ভাগলপুর হইতে বিদ্রোহিদিগকে বেহারে তাড়াইয়া লইয়া চলিলেন। খাদ্যাভাবে বিদ্রোহিদল বিশেষ কষ্টে পড়িল। এই সময়ে ককেশ্‌লান্-বংশীয় পাঠান সর্দ্দার বাবা খাঁর মৃত্যু হয়। বিদ্রোহিদল তাহাতে ভগ্নমনোরথ হইয়া পড়ে।

 এদিকে মসুমকাবুলী সদলে বেহারে আসিলেন। ককেশ্‌লান সর্দ্দার জেব্বাবর্দ্দী খাবাসপুর হইতে তাঁড়ায় স্বদলে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। আরচ্ বাহাদুর পাটনা আক্রমণের সুযোগ দেখিতে লাগিলেন। রাজা টোডরমল্ল সংবাদ পাইবা মাত্র তাঁহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করিলেন। ১৫৮০ খৃষ্টাব্দে রাজা সদলে হাজিপুরে আসিয়া ছাউনী করিলেন এবং উজীর শাহ মনসূরের দুর্ব্ব্যবহারের কথা সম্রাট্‌কে জানাইলেন। তদনুসারে সম্রাট্ আজিম খা মীর্জ্জাকোই নামক একজন ওমরাহকে বেহারের শাসনকর্ত্তা করিয়া পাঠাইয়া দেন।

 এই সময়ে ঝাঁসী ও প্রয়াগের শাসনকর্ত্তা রাজদ্রোহী হইলে টোডরমল্ল শাহবাজ খাঁকে তাহাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। শাহবাজ খাঁ ঝাঁসী ও প্রয়াগের বিদ্রোহ দমন করিয়া অযোধ্যার বিদ্রোহ শান্তি করিলেন। ১৫৮১ খৃষ্টাব্দে অযোধ্যার শাসনকর্ত্তা মসুম ফেরুণ জুদি রাজ্যচ্যুত ও সপরিবারে বন্দী হন। তাঁহার সমুদায় সম্পত্তি রাজকোষে সংগৃহীত হয়।

 এইরূপে বিদ্রোহের অনেকটা শান্তি হইল বটে, কিন্তু বাঙ্গালায় প্রকৃত শান্তি স্থাপিত হইল না। মুসলমান সেনাপতিদিগের সহিত হিন্দুরাজ টোডরমল্লের মনের মিল না হওয়ায় বড়ই বিভ্রাট্ ঘটিতে লাগিল। আজিম খাঁ বেহারে আসিয়া সমুদায় অবস্থা অবগত হইলেন। তিনি বিদ্রোহিদলকে বশে আনিতে না পারিয়া ১৫৮২ খৃষ্টাব্দে আগ্রায় সম্রাটের সহিত এ বিষয়ে পরামর্শ করিতে গেলেন। তথায় স্থির হইল যে, রাজা টোডরমল্লের স্থানে আজিম খাঁকেই বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত করা হউক। তদনুসারে তিনি খান্ আজিম নাম গ্রহণ করিয়া বাঙ্গালা, বেহার ও উড়িষ্যার সুবাদার হইয়া আসিলেন। রাজা টোডরমল্ল বেহার হইতে প্রত্যাগমন করিয়া মোগল-সাম্রাজ্যের একটী রাজস্বহিসাব প্রস্তুত করেন। উহার নাম
“ওয়াশীল তুমার জমা।” ইহাতে বঙ্গভূমি ১৮টী সরকারে ও ৬৮২ মহলে; বেহার প্রদেশ ৭টী সরকারে ও ২০০ পরগণায় এবং উড়িষ্যা ৫টী সরকারে ও ৯৯টী পরগণায় বিভক্ত হইয়াছিল। তৎকালে বাঙ্গালার রাজস্ব ১০৬৮৫৯৪৪৲ টাকা, বেহারের ৫৫৪৭৯৮৪৲ এবং উড়িষ্যার ৪২৬৮৩৩০৲ টাকা ধার্য্য হয়।

[টোডরমল্ল দেখ।]

 খান্ আজিম মীর্জা কোকা ১৫৮২ খৃষ্টাব্দে বাঙ্গালায় আসিয়াই বিদ্রোহী জায়গীরদারদিগের পরস্পরের মধ্যে বিবাদ বাধাইলেন। মসুম কাবুলী স্বীয় অধীনস্থ সেনাদল কর্ত্তৃক পরিত্যক্ত হওয়ায় দেশীয় জমিদারের অধীনে আশ্রয় ভিক্ষা করিতে বাধ্য হইলেন। এইরূপে একে একে সকল বিদ্রোহনেতাই মোগল সর্দ্দারের হস্তগত হইল। ৯৯০ হিজিরায় খান্ আজিম তাঁড়া নগরী অধিকার করিলেন। এতদিনে এই ভয়ঙ্কর বিদ্রোহের শান্তি হইল।

 মোগল জায়গীরদারদিগের এই বিদ্রোহের সময়ে পাঠানেরা আফগান কতলুখাঁর কর্ত্তৃত্বাধীনে সমবেত হইয়া সমুদায় উড়িষ্যার ও দামোদর নদ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা অধিকার করিল। আজিমের আদেশে ফরিদ্ উদ্দীন্ বোখারি কতলু খাঁকে দমনার্থ অগ্রসর হন। কতলু খাঁ পরাজিত হইয়া বন মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই সময়ে সম্রাটের আদেশে খান্ আজিমকে বাঙ্গালা ত্যাগ করিয়া আগ্রায় আসিতে হয়; সুতরাং বাঙ্গালার বিদ্রোহাবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্ত্তন সাধিত হয় নাই।

 আগ্রায় উপনীত হইয়াই খান্ আজিমকে মোগল সাম্রাজ্যের সৈনাপত্য গ্রহণ করিতে হইল; কাজেই সম্রাট্ অকবর শাহ শাহবাজ খাঁ কম্বোকে বহুসংখ্যক সেনা ও মুসলমান সর্দ্দারগণসহ বাঙ্গালায় পাঠাইতে বাধ্য হইলেন। সম্রাটের আদেশ মত শাহবাজ ঘোড়াঘাটে ককেশলানবংশীয় বিদ্রোহী পাঠানদিগকে বিপর্য্যস্ত করিলেন। বিজয়ী মোগল সেনা ক্রমশঃ অগ্রসর হইয়া ব্রহ্মপুত্রতীর পর্য্যন্ত উত্তরবঙ্গ মোগলাধিকারভুক্ত করিল।

 এই সংবাদে হৃষ্টচিত্ত হইয়া সম্রাট্ শাহবাজকেই বাঙ্গালার শাসনকর্ত্তা করিয়াছিলেন। রাজ্যপরিচালনভার স্কন্ধে লইয়া শাহবাজ বড়ই বিব্রত হইয়া পড়িলেন। তিনি ককেশলান্ ও অন্যান্য বিদ্রোহীদিগকে দমন করা অথবা তাহাদের জায়গীর বাজেয়াপ্ত করা একরূপ অসম্ভব বোধ করিলেন। অবশেষে তিনি বাধ্য হইয়াই তাহাদিগকে স্ব স্ব অধিকৃত সম্পত্তি নির্ব্বিবাদে ভোগ করিতে আদেশ দিলেন। আফগান সর্দ্দার কতলু খাঁর সহিত তাহার একটী সন্ধি হইল, তাহাতে তিনি তাহাদিগকে উড়িষ্যা প্রদেশে রাজত্ব করিতে অনুমতি দিলেন। কথা রহিল, পাঠানগণ বাঙ্গালা পরিত্যাগ করিয়া যাইবে, আর বাঙ্গালা আক্রমণ করিবে না।