বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪৫৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (মোগলশাসন)
[৪৫৩]
বঙ্গদেশ (মোগলশাসন)

 ১৭০৭ খৃঃ অব্দে স্বীয় পুত্র ফরুখ্‌সিয়রকে প্রতিনিধি রাখিয়া আজিম উস্‌সান দিল্লীতে প্রত্যাগমন করেন এবং তাঁহার অর্থ ও সৈন্যবলে পর বৎসর তাঁহার পিতা শাহ আলম্ বাহাদুর শাহ নাম ধারণ করিয়া মোগল-সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন। ফরুখ্‌সিয়র মুরশিদাবাদ রাজপ্রাসাদেই থাকিতেন, তিনি মুরশিদকুলি খাঁর কোন কার্য্যে বাধা দিতেন না। সুতরাং ১৭০৬ খৃঃ অব্দ হইতে প্রকৃতই মুরশিদ এদেশে দেওয়ান ও নাজিম পদের সমুদয় কার্য্যই করিতে আরম্ভ করেন। প্রায় এই সময়েই সৈয়দ আব্‌দুল্লা খান্ আলাহাবাদের এবং সৈয়দ হুসেন আলী খান্ বেহারের শাসনকর্ত্তা ছিলেন।

 ১৭১২ খৃঃ অব্দে বাহাদুর শাহের মৃত্যু হয়; আজিম উস্‌সান বাদশাহ হইবার চেষ্টা করিয়া নিহত হন এবং ফরুখ্‌সিয়র বাঙ্গালা পরিত্যাগ করিয়া দিল্লীতে যাইয়া সম্রাট্ হন। ফরুখ্‌সিয়র বাদশাহ হইয়া মুরশিদ কুলি খাঁকে বাঙ্গালা ও উড়িষ্যার নাজিমী পদ প্রদান করেন (১৭১৩)। ১৭১৮ অব্দে মুরশিদ বেহার প্রদেশেরও নাজিম ও দেওয়ান হন।

 মুরশিদ দেওয়ান ও নাজিম হইয়া অন্য লোকের কাছে যেরূপ বাণিজ্যের মাশুল পাইতেন, ইংরাজদিগের নিকটেও তদ্রূপ মাশুল চাহিলেন। ইংরাজেরা সম্রাট্ সমীপে দূত পাঠাইলেন। সম্রাট ফরুখ্‌সিয়র তখন পীড়িত ছিলেন। ঐ দূতদলের মধ্যে ডাক্তার হামিল্টন সাহেবের সুচিকিৎসায় সুস্থ হইলে, তিনি সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাদিগের প্রার্থনানুযায়ী সনন্দ দিলেন। এই সনন্দ দ্বারা স্থিরীকৃত হইল যে, (১) ইংরাজ কোম্পানি বিনা মাশুলে বাঙ্গালায় বাণিজ্য করিতে পারিবেন; (২) তাঁহারা কলিকাতার নিকটবর্ত্তী ৩৮ মৌজা ক্রয় করিতে পারিবেন; (৩) মুরশিদাবাদের টাকশালে সপ্তাহে তিন দিন তাঁহাদিগের জন্য টাকা মুদ্রিত হইবে; (৪) যাহারা ইংরাজদিগের কাছে ঋণী, নবাবের কর্ম্মচারিগণ তাহাদিগকে ইংরাজদিগের হস্তে সমর্পণ করিবেন। ইংরাজেরা এই সনন্দ লইয়া আসিলে সুবাদার ক্ষুণ্ণ হইলেন এবং কলিকাতার সমীপস্থ জমিদারদিগকে ইংরাজদিগের নিকটে জমি বিক্রয় করিতে নিষেধ করিলেন। কিন্তু অপর তিনটী সর্ত্ত সম্বন্ধে তিনি কোন বাধা দেন নাই। সনন্দ দ্বারা ইংরাজদিগের বাণিজ্যের অনেক সুবিধা হইল এবং কলিকাতার সমৃদ্ধি দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।

 মুরশিদ কুলি খাঁ বাঙ্গালার রাজস্বের যে নূতন হিসাব প্রস্তুত করেন (১৭২২ খৃঃ), তদ্দ্বারা বার্ষিক রাজস্ব ১,৪২,৮৮, ১৮৬ টাকা নির্দ্ধারিত হয়। তিনি বঙ্গভূমিকে ১৩ চাকলা, ৩৪ সরকার ও ১৬৬০ পরগণায় বিভক্ত করিয়াছিলেন। সুবাদার জমিদারদিগের নিকট এবং জমিদারেরা প্রজাদিগের নিকট হইতে টাকা
আদায় করিতেন; রাজস্ব-সংগ্রহের জন্য মুরশিদ জমিদারদিগকে অনেক কষ্ট দিতেন। তাঁহার বৈকুণ্ঠের কথা কাহারও অবিদিত নাই। রাজস্ববিভাগের কর্ম্মচারিগণ প্রায় সকলেই হিন্দু ছিলেন। মুরশিদ কুলি খান্ এমন প্রতাপান্বিত হইয়াছিলেন যে ত্রিপুরা, আসাম, কোচবেহার ও বিষ্ণুপুরের স্বাধীন রাজারাও তাঁহার নিকটে উপঢৌকন পাঠাইতেন।

[মুর্শিদ কুলি খাঁ দেখ।]

 ১৭২৫ খৃঃ অব্দে তাঁহার মৃত্যু সময় তিনি স্বীয় দৌহিত্র সরফরাজ খাঁকে বাঙ্গালার প্রতিনিধিত্বে উত্তরাধিকারী বলিয়া যান। ঐ সময়ে সরফরাজ খাঁর পিতা নবাব মোতিমন উল্ মুল্‌ক সুজা উদ্দীন মহম্মদ খান্ সুজা উদ্দৌলা আহ্মদ জঙ্গ বাহাদুর মুরশিদকুলি খাঁর অধীনে উড়িষ্যার শাসনকার্য্যে নিযুক্ত ছিলেন; তিনি সম্রাট মহম্মদ শাহের নিকট হইতে গোপনে বাঙ্গালা ও উড়িষ্যার শাসনাধিকার হস্তগত করিতে চেষ্টা পান। মুরশিদ কুলি খাঁর মৃত্যু হইলে তিনিই প্রথমে তৎপদ অধিকার করেন এবং পুত্র সরফরাজ খাঁকে বাঙ্গালার দেওয়ানী পদে রাখিয়া তাঁহার ক্রোধ শান্তি করিলেন। এই সময়ে বাদশাহ নসরৎ খাঁকে বেহারের শাসনভার প্রদান করেন। তদনন্তর তিনি তৎপদে ফখর উদ্দৌলা নামক এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়াছিলেন।

 রাজস্ব বন্ধ করা দোষে যে সকল জমিদার কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন, দয়াপরবশ সুজা তাহাদিগকে মুক্তি দেন এবং আলমচাঁদ নামক একজন হিন্দুকে সহকারী দেওয়ান করিয়া তাঁহার জন্য দিল্লী হইতে ‘রায়-রাঁয়া’ উপাধি আনান। আলমচাঁদ, জগৎশেঠ এবং হাজি আহ্মদ ও আলিবর্দ্দী খান্ নামক দুইজন আত্মীয়, এই চারি জন লইয়া সুজা একটি মন্ত্রিসভা গঠিত করেন। তিনি ঐ সভার পরামর্শ গ্রহণপূর্ব্বক রাজকার্য্য নির্ব্বাহ করিতেন। এই সকল কারণে নবাব সুজা প্রথমে হিন্দুদিগের বিশেষ ভক্তিভাজন ছিলেন।

 মুরশিদ কুলীর দোর্দণ্ড প্রতাপে বাঙ্গালা সশঙ্কিত ছিল। তখন বাঙ্গালার সৈন্যসংখ্যা অনেক কম ছিল। সুজা বাঙ্গালার সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেন; এতদ্ভিন্ন তিনি অন্যান্য জাঁকজমকেও মত্ত ছিলেন। তিনি মুরশিদ কুলি খাঁর ন্যায় নিয়মিতরূপে দিল্লীতে রাজস্ব পাঠাইতেন। বৃথা আড়ম্বরপ্রিয়তায় তাঁহার ব্যয় অত্যন্ত বাড়িয়া যায়। এই নিমিত্ত তিনি নির্দ্দিষ্ট রাজস্বের অতিরিক্ত আবওয়াব নামক কর সংগ্রহ করিতে বাধ্য হন। আবওয়াব তাঁহার সময়ে প্রায় ২২ লক্ষ হইয়া উঠে। আলিবর্দ্দী ও মীরকাশিমের শাসনকালে উহা ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতে থাকে। যখন কোম্পানি বাহাদুর স্বহস্তে বাঙ্গালার দেওয়ানী গ্রহণ করেন (১৭৬৫ খৃঃ), তখন বাঙ্গালার মোট রাজস্ব আড়াই কোটিরও অধিক ছিল।