বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪৫৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (মোগলশাসন)
[৪৫৪]
বঙ্গদেশ (মোগলশাসন)

 ১৭১৯ খৃঃ অব্দে বেহারের শাসনকর্ত্তা ফখ্‌র উদ্দৌলা পদচ্যুত হইলে সুজা তথাকার সুবাদার হন। তিনি আলিবর্দ্দি খাঁকে বেহারের শাসনভার দেন। আলিবর্দ্দি বেতিয়া চকবাড়ী, ফুলবাড়ী ও ভোজপুরের বিদ্রোহী জমিদারদিগকে পরাজিত ও শাসিত করিয়া বেহারে শান্তিস্থাপন করেন। ১৭৩২ অব্দে ঢাকার দেওয়ান মীর হবিব্ ত্রিপুরা জয় করিয়া তাহার রোশেনাবাদ নাম রাখেন। অনন্তর সরফরাজ খাঁ ঢাকার শাসনকর্ত্তৃপদে নিয়োজিত হন; কিন্তু তিনি মুরশিদাবাদেই বাস করিতেন। তাঁহার দেওয়ান যশোবন্ত রায় সুচারুরূপে রাজকার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া সকলের প্রীতিভাজন হন। তাঁহার আমলেও সায়েস্তা খাঁর সময়ের ন্যায় পুনর্ব্বার টাকায় ৮ মণ চাউল বিক্রয় হইয়াছিল (১৭৩৫ খৃঃ)। ইহার দুই বৎসর পরে রঙ্গপুরের ফৌজদার হাজি আহ্মদের মধ্যমপুত্র সৈয়দ আহ্মদ দিনাজপুর ও কোচবেহার আক্রমণ করিয়া তত্রত্য রাজাদিগের বহুকাল সঞ্চিত ধনরাশি হস্তগত করেন।

 তাঁহার শাসনকালে ১৭২৪ খৃষ্টাব্দে অষ্টেণ্ড ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী বাঙ্গালার বাণিজ্যার্থ আগমন করেন। বাঁকি-বাজারে তাঁহাদের কুটী স্থাপিত ছিল। এই জর্ম্মণ-বণিকসম্প্রদায়ের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ঈর্ষান্বিত হইয়া ইংরাজ ও ওলন্দাজ বণিক্‌গণ তাঁহাদের বিরুদ্ধাচারী হইলেন। তাঁহাদের প্ররোচনায় নবাব সুজা উদ্দীন্ ১৭৩৩ খৃষ্টাব্দে জর্ম্মণদিগের কুটী অবরোধ করিলেন। অবশেষে নবাব সেনাপতি মীর জাফর বাঁকিবাজার হস্তগত করিয়া ঐ কুটী ধ্বংস করেন।[ব্যাখ্যা ১]

 ১৭৩৯ খৃঃ অব্দে সুজা উদ্দীন মানবলীলা সংবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি হাজি আহ্মদ, জগৎশেঠ ও আলমচাঁদ এই কয়েকজনের পরামর্শ লইয়া স্বীয় পুত্র আলা উদ্দৌলা সরফরাজকে রাজকার্য্য নির্ব্বাহ করিতে আদেশ করিয়া যান। কিন্তু সরফরাজ সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই হাজি আহ্মদ ও জগৎশেঠকে অবমানিত করিলেন। তাহাতে তাঁহারা ক্রুদ্ধ হইয়া দিল্লী হইতে আলিবর্দ্দী খাঁর নিমিত্ত বাঙ্গালা, বেহার ও উড়িষ্যার সুবাদারী পদের নিয়োগপত্র সংগ্রহের ষড়যন্ত্র করিতে ছিলেন। এই


  1. মুসলমান ঐতিহাসিকগণ জর্ম্মণ বণিক্‌সম্প্রদায়ের বাঙ্গালায় অবস্থিতি সম্বন্ধে একমত নহেন। কেহ কেহ বলেন, সুবাদার মুরশিদ কুলীর শাসনকালেই জর্ম্মণ বণিকদিগের প্রভাব বিলুপ্ত হয়। ঐতিহাসিক অর্ম্মি বলেন, ১৭৩৮ খৃষ্টাব্দে তাঁহারা এ স্থান হইতে তাড়িত হইয়াছিলেন। কিন্তু অষ্টেণ্ড কোম্পানীর বিবরণীতে প্রকাশ ৭ বৎসর মেয়ান অন্তে ১৭৩০ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত ক্রমশঃ তাঁহাদের বাণিজ্যপ্রভাব খর্ব্ব হইতে থাকে এবং ১৭৩৩ খৃষ্টাব্দের যুদ্ধে তাঁহাদের শেষ বাণিজ্য পোতখানি বাঙ্গালা হইতে বিতাড়িত হয়। ১৭৮৪ খৃষ্টাব্দে উক্ত কোম্পানী ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়ে এবং ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে উহা বন্ধ হইয়া যায়।
সহযোগিতা লাভ করিয়া আলিবর্দ্দী সসৈন্যে সরফরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। মুরশিদাবাদ সন্নিহিত গড়িয়া নামক স্থানে সরফরাজ পরাজিত ও নিহত হইলে (১৭৪০ খৃঃ) আলিবর্দ্দী বাঙ্গালার সুবাদার পদে অধিষ্ঠিত হইলেন।

 আলিবর্দ্দী সুবাদার হইয়া দিল্লীতে অনেক উপঢৌকন প্রেরণান্তে রাজ্যশাসনের নূতন বন্দোবস্ত করেন। তাঁহার তিন কন্যার সহিত তাঁহার ভ্রাতা হাজি আহ্মদের তিন পুত্ত্রের বিবাহ হইয়াছিল। ঐ জামাতৃত্রয় মধ্যে নিবাইস মহম্মদকে তিনি ঢাকার এবং কনিষ্ঠ জৈন উদ্দিনকে বেহারের শাসনভার প্রদান করিলেন। জৈন উদ্দিনের পুত্ত্র সিরাজ উদ্দৌলাকে তিনি অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। এই কারণ ঐ বালককে তিনি সর্ব্বদাই দত্তকপুত্ত্রস্বরূপ পালন করিতেন; অতঃপর সরফরাজ খাঁর ভগিনীপতি উড়িষ্যার শাসনকর্ত্তা মুরশিদ কুলিকে পরাজিত করিয়া তিনি স্বীয় মধ্যম জামাতা সৈয়দ আহ্মদকে সে প্রদেশের শাসনভার অর্পণ করেন। কিন্তু আহ্মদের অসদাচরণে শীঘ্রই উৎকলে বিদ্রোহ হয়; এবং মুরশিদ কুলির দল প্রবল হইয়া আহ্মদকে কারারুদ্ধ করে। এই সংবাদ পাইয়া আলিবর্দ্দী উড়িষ্যায় গমন পূর্ব্বক জামাতার উদ্ধার সাধন করেন।

 এই সময়ে ১৭৪১ খৃঃ অব্দে চৌথের দাবী করিয়া মহারাষ্ট্রগণ বাঙ্গালা আক্রমণ করিয়া ভাগীরথীর পশ্চিমতীরবর্ত্তী প্রশে অধিকার ও লুঠপাঠ করিয়া প্রজাদিগকে যৎপরোনাস্তি কষ্ট প্রদান করে। তাহাদিগের অত্যাচারভয়ে কলিকাতাবাসিগণ নগররক্ষার্থে ‘মারহাট্টা খাত’ কাটিতে আরম্ভ করেন।

 নবাব সুজা উল্ মুল্‌ক, হিসাম উদ্দৌলা মহম্মদ আলীবর্দ্দী খাঁ মহব্বত জঙ্গ বাহাদুর এই সংবাদে উড়িষ্যা বিজয়ের আমোদ-প্রমোদ ভুলিয়া মহারাষ্ট্র বীর্য্য খর্ব্ব করিবার জন্য যুদ্ধের উদ্যোগে ব্যাপৃত রহিলেন। পর বৎসর তিনি তাহাদিগকে কাটোয়ার নিকটে পরাজিত করিয়া দেশ হইতে বহিষ্কৃত করেন (১৭৪২ খৃঃ)। অনন্তর তাহারা বারংবার এতদ্দেশ আক্রমণ করিয়া সুবাদারকে ব্যতিব্যস্ত করে; পরিশেষে আলিবর্দ্দী তাহাদিগকে কটক প্রদেশ প্রদান করিয়া এবং বাঙ্গালার চৌথস্বরূপ বৎসর বৎসর বার লক্ষ টাকা দিতে স্বীকৃত হইয়া সন্ধি করেন (১৭৫১)। এই মহারাষ্ট্র আক্রমণ বাঙ্গালায় “বর্গির হাঙ্গামা” বলিয়া খ্যাত।

 বর্গির হাঙ্গামার সময়ে এদেশে তিনবার বিদ্রোহ উপস্থিত হয়। প্রথম সেনাপতি মুস্তাফা খাঁ বিদ্রোহী হইয়া বেহারের শাসনকর্ত্তা জৈন উদ্দিন কর্ত্তৃক নিহত হন। অনন্তর শামসের খাঁ বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ব্বক জৈন উদ্দিন ও তাঁহার পিতা হাজি আহ্মদকে বিনষ্ট করে। কিন্তু আলিবর্দ্দীর সহিত পাটনা যুদ্ধে তিনি বাঢ় নামক স্থানে পরাজিত ও নিহত হন (১৭৪৯ খৃঃ।)