বিকাইতে শিক্ষা করে। নীলকরগণ কিরূপ অমানুষিক অত্যাচারে বাঙ্গালার প্রজাবর্গকে নির্জ্জিত করে, তাহা নীলদর্পণ-পাঠকগণ সহজেই উপলব্ধি করিতে পারেন। এই নীলের চাষ একদিন পূর্ব্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ বঙ্গের সকল স্থানেই প্রায় প্রচলিত ছিল। প্রতি ১০ মাইলের মধ্যে নীলকর বণিক্দিগের একটী না একটী কুঠী স্থাপিত হইয়াছিল। সেই সকল নীলকুঠীর ধ্বংসাবশেষ আজিও বাঙ্গালার সেই অতীত দুঃখস্মৃতি জ্ঞাপন করিতেছে।
যে সকল গ্রামে নীলকুঠী স্থাপিত হইয়াছিল, সেই সকল গ্রামের অধিকাংশ ধনাঢ্য ব্যক্তিই ঐ কুঠীর দেওয়ান বা দারোগা হইতেন। তাঁহারাও ইংরাজসংস্পর্শে আসিয়া অনেকাংশে ইংরাজের ন্যায় কঠোর প্রকৃতি হইয়া পড়েন। তাঁহাদের ন্যায় ক্ষুদ্র ভূম্যধিকারীর অত্যাচারেও বাঙ্গালার প্রজাগণ সশঙ্কিত হইয়াছিল।
বণিকবেশে ইংরাজবণিক বাঙ্গালায় প্রবেশ করেন। বাঙ্গালার উর্ব্বর ও শস্যপূর্ণ সমতলক্ষেত্র সহজেই তাঁহাদের চিত্ত আকর্ষণ করে। এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ ভাগ নদীজালে সমাকীর্ণ হওয়ায় তাঁহারা সহজেই বাঙ্গালার অভ্যন্তর ভাগে প্রবেশ করিতে সমর্থ হইলেন। ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এরূপ গমনাগমনের সুবিধা না থাকায় এবং তদ্দেশ ভাগ শস্যসমৃদ্ধিপূর্ণ না হওয়ায় চতুর ইংরাজগণ সে সকল স্থান বিশেষ সুবিধাজনক মনে করেন নাই। কারণ তখন এদেশে রেলপথ ছিল না। নৌকাপথেই তখনকার পণ্যদ্রব্যবহনের একমাত্র উপায় ছিল। সেই কারণেই ইংরাজগণ তথাকার অধিবাসীদের সহিত আত্মীয়তা স্থাপনপূর্ব্বক মিশিতে পারেন নাই। বাঙ্গালায় তাঁহাদের সে সুবিধা ঘটিয়াছিল।
নীল বাঙ্গালা ভিন্ন ভারতের অপর কোথাও পর্য্যাপ্ত উৎপন্ন হয় না এবং পণ্যদ্রব্যবহনের বিশেষ সুবিধা দেখিয়া ইংরাজবণিকগণ নীলকরবেশে বাঙ্গালায় উপনিবেশ স্থাপন করেন। এখনও নদীয়া ও যশোহর জেলায় অনেক উপনিবেশী ইংরাজ জমিদারী ক্রয় করিয়া তাহার উপসত্ত্ব ভোগ করিতেছেন।
পূর্ব্বকালে নীলের দাদন উপলক্ষেই ইংরাজের সহিত বঙ্গবাসীর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ঘটে। সেই সূত্রে এবং বাণিজ্য ব্যপদেশে তাঁহারা বাঙ্গালার নবাব সরকারের অনেক হিন্দুকর্ম্মচারীর সহিত মিত্রতা করিয়া লন। এমন কি, সেই ব্যবসায়ী ইংরাজ বণিকদিগের অমায়িকতায় স্থানীয় অনেক প্রসিদ্ধ জমিদার ও রাজার সহিত তাঁহাদের সদ্ভাব ঘটে, সেই মেলামেশায় তাঁহারা তৎকালিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রের প্রকৃত অবস্থা অবগত হইতে থাকেন। সিরাজকে রাজ্যচ্যুত করিবার ষড়যন্ত্র যখন ইংরাজ বণিকের কর্ণে যায়, তখন তাঁহারা উদ্গ্রীব হইয়া সেই আন্দো-ইংরাজ রাজা হইলেন বটে, কিন্তু তাঁহাদিগের শাসনে এদেশে তিনটি মহৎ অনিষ্ট সাধিত হয়। নবাব সরকারের দুরবস্থা লক্ষ্য করিয়া ইংরাজ এদেশীয় লোককে উচ্চতম রাজকার্য্যে নিযুক্ত করেন নাই; বরং ম্যাঞ্চেষ্টরনিবাসী ইংরাজবণিকদিগের বস্ত্রব্যবসার প্রশ্রয় দিতে এখানকার বস্ত্রব্যবসায়ীদিগের বিলক্ষণ দুর্দ্দশা ঘটাইয়াছিলেন। তাঁহাদিগের অনুকরণে বাঙ্গালার শিক্ষিত সমাজে সুরাপানের প্রভাব বৃদ্ধি হয়। কিন্তু লর্ড লরেন্স, কেশবচন্দ্র সেন, প্যারীচরণ সরকার প্রভৃতির যত্নে সুরাপানের স্রোত অনেকটা কমিয়া যায়। পরবর্ত্তিকালে এতদ্দেশবাসীরা, “সিবিল সার্ব্বিসে” প্রবেশ করিতে সমর্থ হওয়ায় হাইকোর্টের জজ ও ব্যবস্থাপক সভার মেম্বর হইতে পারিয়াছেন এবং এইরূপে তাঁহারা কিয়ৎপরিমাণে অন্যান্য উচ্চপদেও আরোহণ করিতে সমর্থ হইয়াছেন। এদেশে এখন বাণিজ্যের প্রবাহ বহিতেছে। মাঞ্চেষ্টারের বস্ত্র-ব্যবসার প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া এখানে কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
মুসলমান শাসনসময়ে জমিদারেরা করদ রাজাদিগের ন্যায় ছিলেন; ইংরাজ-রাজত্বকালে তাঁহাদিগের সে অবস্থা লয় পাইয়াছে। তাঁহাদিগের আর পূর্ব্বের মত রাজক্ষমতাসূচক সৈন্য, গড় ও স্বতন্ত্র বিচারালয় স্থাপনের অধিকার নাই। দশশালা বন্দোবস্তের পর হইতে নিরূপিত দিনে রাজস্ব না দিলে জমিদারী নিলাম হইবে, এই নিয়মে প্রাচীন জমিদারদিগের অনেক অপকার হইয়াছে। এ প্রকার নির্দ্দিষ্ট নিয়মে রাজকর দেওয়া তাঁহাদিগের অভ্যাস ছিল না, সুতরাং তাঁহাদিগের রাজস্ব বাকি পড়িতে লাগিল এবং তাঁহাদিগের ভূসম্পত্তি বাণিজ্যব্যবসায়ী লোকের হাতে যাইতে আরম্ভ হইল। এইরূপে অল্পদিন মধ্যে বহু জমিদার বিষয়চ্যুত হইয়া পড়িলেন। নদীয়া, নাটোর প্রভৃতি রাজবংশে এইরূপে দুর্দ্দশা ঘটিয়াছিল।
ইংরাজদিগের সময়ে বাঙ্গালায় চিরশান্তি বিরাজমান করিয়াছে; এজন্য সমাজসংস্কার ও ভাষার উন্নতির দিকে দৃষ্টি করিতে সকলে অবসর পাইয়াছেন। রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসমাজ সংস্থাপন এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বহুবিবাহ নিবারণ সম্বন্ধে আন্দোলন করিয়া সমাজসংস্কারের