বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্বকোষ সপ্তদশ খণ্ড.djvu/৪৬৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বঙ্গদেশ (ইংরাজশাসন)
[৪৬৭]
বঙ্গদেশ (ইংরাজশাসন)

পথ খুলিয়াছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি গ্রন্থকারদিগের দ্বারা বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্যের বিলক্ষণ উন্নতি হইয়াছে। কবিওয়ালা, পাঁচালীওয়ালা, কীর্ত্তনওয়ালা, এবং যাত্রাওয়ালাদিগের গীতেও বাঙ্গালা ভাষায় মধুরতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। বঙ্গীয় রঙ্গালয়সমূহেও ইংরাজী অনুকরণের যথেষ্ট প্রভাব লক্ষিত হইতেছে। ইংরাজদিগের আমলেই বোধ হয়, বাঙ্গালা গদ্যগ্রন্থের বহুল প্রচার আরম্ভ। ফরেষ্টর সাহেবের ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে বিধিব্যূহের বাঙ্গালা অনুবাদের পূর্ব্বে আরও অনেক গদ্যপুঁথির পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। [বাঙ্গালা ভাষা দেখ।]

 খৃষ্টান মিসনরিদিগের যত্নে কৃত্তিবাসের রামায়ণ ও কাশীদাসের মহাভারত প্রথম মুদ্রিত হয়। পরে তাঁহারাই বাঙ্গালা সংবাদপত্র ছাপাইতে আরম্ভ করেন। শ্রীরামপুরের কলেজ, কলিকাতার কয়েকটী কলেজ ও স্থানে স্থানে অন্য প্রকার বিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ায় এতদ্দেশীয় লোকের বিদ্যাশিক্ষার যথেষ্ট সাহায্য হইয়াছে। কেরী, মার্সম্যান ও ডফ সাহেবের নাম এদেশের কৃতবিদ্য ব্যক্তিগণ সহজে ভুলিবেন না। তাঁহাদের যত্নে ও উদ্যোগে বাঙ্গালায় ইংরাজীশিক্ষা দৃঢ়ভিত্তি লাভ করে। সেই শিক্ষাফলে ক্রমে এখানে হিন্দু পেটিয়ট, বেঙ্গল হরকরা, ইণ্ডিয়ান ডেলী নিউস, ইণ্ডিয়ান মিরর, ষ্টেটস্‌ম্যান, ইংলিশম্যান, বেঙ্গলী ও অমৃতবাজার প্রভৃতি ইংরাজী সংবাদ পত্র এবং সঞ্জীবনী, বঙ্গবাসী, বসুমতী, হিতবাদী প্রভৃতি বাঙ্গালা সংবাদ পত্র প্রচারিত হইতেছে।

 বাঙ্গালার প্রাচীন বাণিজ্যসমৃদ্ধি কাহারও অবিদিত নাই। যে আশায় পর্ত্তুগীজ, ইংরাজ, ওলন্দাজ, দিনেমার ও জর্ম্মণ বণিক্‌গণ এখানে আসিয়াছিলেন, তাহার প্রভাব তৎকালে বাঙ্গালায় কিরূপ বলবৎ ছিল, তাহা ১৭৫৩ খৃষ্টাব্দে ইতিহাসলেখক অর্ম্মির উক্তিতে স্পষ্টতর প্রতিভাত হইয়াছে। তিনি বলেন, ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশাপেক্ষা বাঙ্গালার বাণিজ্য বহুবিস্তীর্ণ ছিল। তখন এখান হইতে সমুদয় কার্পাস ও পট্টবস্ত্র দিল্লীতে রপ্তানী হইত। এতদ্ভিন্ন আরব, পারস্য ও ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশে রেশম ও রেশমী কাপড়, কার্পাসবস্ত্র, চিনি, অহিফেন, শস্য প্রভৃতি প্রেরিত হইত। তখন বাঙ্গালাই য়ূরোপীয়দিগের প্রধান ব্যবসায়ের স্থান ছিল। এই বাণিজ্যক্ষেত্রে ইংরাজজাতি অস্ত্রবিনিময়ে পণ্যরূপে বঙ্গরাজ্য ক্রয় করিয়াছিলেন, তাহা ইতিহাসপ্রসঙ্গে বিবৃত হইয়াছে। বাণিজ্য উপলক্ষে বাঙ্গালীর সহিত ঘনিষ্টতাই ইংরাজজাতির উন্নতির মূল এবং সেই মেশামিশিই বাঙ্গালীর অধঃপতনের কারণ। তখন এদেশে সদর রাস্তা বা কোন প্রধান নগর হইতে কিছু দূরে গমন
করিলে এমন কোন গ্রাম পাওয়া যাইত না, যেখানে প্রত্যেক পুরুষ, স্ত্রী বা শিশু বস্ত্রনির্ম্মাণ কার্য্যে নিযুক্ত ছিল না। অপর বাণিজ্যদ্রব্যজাত সম্বন্ধে যাহা হউক, বস্ত্রনির্ম্মাণ সম্বন্ধে এদেশের তন্তুবায়-সমিতি সভ্য জগতের শীর্ষস্থান লাভ করিয়াছিল, কিন্তু এখন আর পূর্ব্বের সে অবস্থা নাই, এখন আর ঘরে ঘরে চর্কা ঘুরে না। এখন এখান হইতে বিদেশে কাপড় যায় না। এখন ম্যাঞ্চেষ্টরের প্রতিযোগিতায় আমাদের সে বাণিজ্য-গৌরব অস্তমিত হইয়াছে। সামান্য পরিমাণে তাঁতের কাপড় ব্যতীত মস্তক উত্তোলন করিতে পারিবে, এরূপ সম্ভাবনা নাই। এখানে এবং বোম্বাই প্রদেশে এখন অতি অল্প পরিমাণেই কলে মোটা কাপড় প্রস্তুত হইতেছে।

 ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে যশোহরজেলায় প্রথম ওলাউঠা দেখা দেয়, পরে উহা ভারতব্যাপী হইয়া পড়িয়াছে। সময়ে সময়ে এই রোগের উৎপাতে সকল দেশের অধিবাসীরাই ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়ে। কয়েক বৎসর হইতে নদীয়া, হুগলী, বর্দ্ধমান, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলায় “সঞ্চারী জ্বরে” অনেক লোকের মৃত্যু হইয়াছে। ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জা ও বোম্বাই প্লেগ দেখা দিয়া এখনও দেশের সর্ব্বনাশ করিতেছে। বৈজ্ঞানিকগণ অনুমান করেন, নদী, খাল প্রভৃতি ক্রমে পলি মাটি দ্বারা ভরাট হইয়া এবং স্থানে স্থানে প্রয়োজনীয় পয়ঃপ্রণালী না রাখিয়া রাস্তা নির্ম্মিত হওয়ায় জল নির্গমের বাধা জন্মিয়া এই জ্বরের উৎপত্তি ঘটিতেছে। বর্ষা ঋতুতে নিম্নবঙ্গের গুল্মলতাদি পচিয়া এক প্রকার দুর্গন্ধময় বাষ্প উত্থিত হয়। ঐ অবিশুদ্ধ বায়ুসেবনে রক্ত দূষিত করিয়া ম্যালেরিয়াদি রোগ উৎপাদন করে। অনেকে বিবেচনা করেন যে, তিনশত বৎসর পূর্ব্বে যে মহামারীতে গৌড়নগর জনশূন্য হইয়াছিল, তাহাও এইরূপ এক প্রকার জ্বর।

 ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে এদেশে একটী ভয়ঙ্কর ঝটিকাবর্ত্ত উপস্থিত হইয়া অনেক অপকার করিয়াছিল। বহুসংখ্যক বৃক্ষ ও গৃহ ধরাশায়ী হইয়াছিল, অনেক জাহাজ ও নৌকা ডুবিয়াছিল; এবং ঝড়ের প্রতাপে বঙ্গোপসাগরের সলিলরাশি চব্বিশ পরগণার দক্ষিণাংশে প্রবেশ করিয়া কত মনুষ্য, জীবজন্তু ও লোকালয় বিনষ্ট করিয়াছিল, তাহার ইয়ত্তা নাই। ইহা বাঙ্গালায় ১২৭০ সালের আশ্বিন মাসে ঘটে বলিয়া আশ্বিনে ঝড় নামে খ্যাত। তৎপরে ১২৭৪ সালের কার্ত্তিক মাসে কার্ত্তিকে ঝড় হয়। ১২৭৬ সালেও একটী ঝড় হইয়াছিল। এ প্রকার ঝটিকা এদেশের পক্ষে নূতন নহে, আইন আকবরী পাঠে জানা যায় যে, ১৫৮৩ খৃষ্টাব্দে এদেশে একটী বজ্রবিদ্যুৎসহকৃত ভীষণ ঝটিকাবর্ত্ত উপস্থিত হইয়াছিল। উহার প্রভাবে সমুদ্রবারি উত্থিত হইয়া দেবমন্দিরচূড়া ও অত্যুচ্চ স্থান ব্যতীত বাখরগঞ্জ প্রদেশের অনেকাংশ