বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/১০০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৮২
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

 কত সম্রাট এল আর গেল। সব অকর্মণ্যের দল। ক্রমে ক্রমে সেনা-বিভাগ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল; সম্রাটকে তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত। কাজেকাজেই সেনা-বিভাগকে হাতে না রাখলে চলে না, দিতে হয় ঘুষ। সেই ঘুষের জোগাড় হত জনগণকে শোষণ করে। দাসব্যবসা চলত পুরোদমে এবং সেটা ছিল রাজস্ববৃদ্ধির প্রধান উপায়। প্রাচীন গ্রীসের পবিত্র ডেলস্-দ্বীপ ছিল দাসব্যবসায়ের একটা প্রধান কেন্দ্র। দাসরা পরস্পরকে হত্যা করে সকলের সামনে অস্ত্রখেলা দেখাত; কোনো-এক সম্রাট তো একই সময়ে একত্রে বারো শো ক্রীতদাসের খেলা দেখাবার ব্যবস্থা করতেন।

 এই তো রোম-সাম্রাজ্যের সভ্যতা। কিন্তু গিবন তাঁর বইতে কী লিখেছেন, জানো? লিখেছেন: “যদি কাকেও বলা যায় পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটা সময়ের উল্লেখ করো যখন মানবজাতি সবরকম সুখসমৃদ্ধির অধিকারী হয়েছিল, সে নিশ্চয় বিনা দ্বিধায় বলবে, দোমিতানের মৃত্যুর পর থেকে কমোডাসের সিংহাসন আরোহণের মধ্যবর্তী কাল”—অর্থাৎ খৃষ্টীয় ৯৬ থেকে ১৮০ অব্দের মধ্যবর্তী চুরাশি বছর। আশ্চর্য, গিবন জ্ঞানী লোক হয়েও এমন কথা কী করে বললেন। অধিকাংশ লোকই নিশ্চয় এ কথায় সায় দেবে না। মানবজাতি অর্থে তিনি প্রধানত ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর অধিবাসীদের কথাই বলেছেন; কেননা, ভারতবর্ষ চীন কিংবা প্রাচীন মিশর সম্বন্ধে সম্ভবত তাঁর কোনো জ্ঞান ছিল না।

 কিন্তু হয়তো আমি রোম সম্পর্কে একটু অবিচার করছি। বস্তুত সীমান্তে অহরহ লড়াই চললেও প্রথম দিকটায় সাম্রাজ্যের ভিতরে শান্তি স্থাপিত হয়েছিল। দেশ নিরুপদ্রব হওয়াতে ব্যবসাবাণিজ্যেরও উন্নতি হয়েছিল। নাগরিক অধিকার সকলকেই দেওয়া হত; তাই বলে ক্রীতদাসদের নয়। জনগণের বিশেষ-কোনো ক্ষমতা ছিল না, সম্রাটই ছিলেন সর্বেসর্বা। রাজনীতি আলোচনা করলেই রাজদ্রোহের দায়ে পড়তে হত। উচ্চশ্রেণীর সকল সম্প্রদায়ের লোকের জন্যে একই আইন এবং একই শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল।

 কালক্রমে রোমানরা বড়ো অলস হয়ে পড়ল, যুদ্ধ করবার ক্ষমতাটকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলল। পল্লী অঞ্চলের লোক করভারে ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ল, নগরবাসীদের অবস্থাও তদ্রূপ। সম্রাট নাগরিকদের খুশি রাখবার চেষ্টা করেন, যাতে না কোনো ফ্যাশাদ বাধায় ওরা। রোম-নগরের অধিবাসীদের জন্যে বিনা মূল্যে রুটি বিতরণ আর বিনা দর্শনীতে আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু কত কাল এবং কত জায়গায়ই-বা এই ব্যবস্থা বজায় রাখা চলে? আর ঐ রুটির জোগাড় হত কোথা থেকে জানো? মিশর প্রভৃতি দেশের ক্রীতদাসদের অংশে ভাগ বসিয়ে। সেখান থেকে বিনা মূল্যে ময়দা জোগাড় করা হত।

 রোমানরা তো যেন যুদ্ধবিদ্যা ভুলে গেল, কিন্তু সেনাদল রাখতে হবে যে! সৈনাবিভাগে লোক সংগ্রহ করা হ’ত বর্বর জাতি থেকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল রোমের শত্রু; এদের দলের লোকরাই সীমান্তে অনবরত গোলযোগ সৃষ্টি করছিল। রোম-নগর যত শক্তিহীন হতে লাগল, এই অসভ্যজাতি তত দুঃসাহসী আর ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল। পূর্ব-সীমান্ত ছিল অরক্ষিত এবং সেদিক থেকেই ছিল বিপদের আশঙ্কা। অগাস্টাস সিজারের তিন শো বছর পরে সম্রাট কন্‌স্টাণ্টাইন এমন এক ব্যবস্থা করলেন যার ফল হল সুদূরপ্রসারী। রোম-নগর থেকে সাম্রাজ্যের রাজধানী তিনি সরিয়ে নিলেন, কৃষ্ণসাগর আর ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী বস্ফোরাস্ উপসাগরের তীরে বাইজেন্‌টাম্-নগরের নিকটে তিনি এক নূতন শহর গড়ে তুললেন। নিজের নাম অনুসারে তার নাম রাখলেন কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্। তখন থেকে এই নগরই হল রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী। এশিয়ার কোনো কোনো অংশে কন্‌স্টাণ্টিনোপ্‌ল্‌ আজও ‘রুম’ নামে পরিচিত।