জন্মদিনের চিঠি
ছেলেবেলা থেকেই তোমার জন্মদিনে তুমি উপহার আর শুভেচ্ছা পেয়ে এসেছ। নাইনির জেল থেকে আমি কেবল তোমায় আন্তরিক শুভেচ্ছাই পাঠাতে পারি। উপহার আর কী পাঠাব তোমায়? কয়েদখানার ভিতর থেকে তোমায় যে উপহার আমি পাঠাব তাকে বন্দী করে এমন সাধ্যি এই চারদিকের উঁচু প্রাচীরের নেই, কারণ সে উপহার হল আমার মনের জিনিষ!
তুমি তো জানো, সদুপদেশ দেওয়া আমার ধাতে সয় না। যখনই ওরকম একটা-কিছু করতে আমার ইচ্ছা হয় তখনই আমার মনে পড়ে সেই বিজ্ঞ লোকের উপাখ্যান। এ গল্পটি যে বইয়ে আছে সেটি তুমি একদিন হয়তো পড়বে। তেরো শো বছর আগে চীনদেশের একজন পরিব্রাজক এসেছিলেন আমাদের দেশে, জ্ঞানান্বেষণ করতে। জ্ঞানস্পৃহা তাঁর এত প্রবল যে উত্তরদিকের কতশত পাহাড়পর্বত, নদনদী, মরুভূমি অতিক্রম করে, বহু সংকট, অনেক বাধা তুচ্ছ করে তিনি এসেছিলেন। তাঁর নাম ছিল হিউয়েন সাঙ। আজকাল যে শহরের নাম পাটনা, পরাকালে তারই নাম ছিল পাটলিপুত্র—সেই পাটলিপুত্রের নিকটবর্তী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বহু কাল অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করেছিলেন। তাঁর জ্ঞান ও ব্যুৎপত্তির জন্য এবং বৌদ্ধনীতিশাস্ত্রে তাঁর অসামান্য অধিকার থাকার দরুন তাঁকে “নীতিবিশারদ” আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। সেকালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে যাঁরা বসবাস করতেন তাঁদের আচারব্যবহার, রীতিনীতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি এক ভ্রমণকাহিনী লিখেছিলেন। আমার যে উপাখ্যানের কথা মনে হয়েছে সেটা এই বই থেকে নেওয়া। এই উপাখ্যানে বর্ণিত বিজ্ঞ লোকটি ছিলেন দক্ষিণী—তিনি কর্ণসুবর্ণ নগরীতে (আজকালকার ভাগলপুরে) একটা বিচিত্র পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতেন, তাঁর মাথায় বাঁধা থাকত একটা জ্বলন্ত মশাল, তাঁর কোমর থেকে উদর অবধি ঢাকা থাকত তামার পাত দিয়ে। লম্বা লম্বা পা ফেলে, হাতে প্রকাণ্ড একটা লাঠি নিয়ে, বুক ফুলিয়ে তিনি বেড়াতেন। লোকে প্রশ্ন করলে বলতেন, তাঁর অগাধ জ্ঞান পেট ফেটে বেরিয়ে যেতে পারে এই ভয়েই ওরকম ব্যবস্থা করতে হয়েছে। অজ্ঞানান্ধকারে যারা পথ খুঁজে হাতড়ে বেড়াচ্ছে তাদেরই জন্যে তিনি মাথায় মশাল ধরে থাকেন—এইরকম ছিল তাঁর জবাব।
ভাগ্যিস আমার অগাধ জ্ঞান নেই, কাজেই আমার বর্মে চর্মেও কাজ নেই। আর যাই হোক, জ্ঞান যে আমার উপরপ্রদেশে বাস করে না এ বিশ্বাসটকু আমার আছে। এও জানি যে জ্ঞানের বাসস্থান যেখানেই হোক না কেন, এবং সে যতই বৃদ্ধি লাভ করুক না কেন, তার স্থান সংকুলান হবেই। কাজেই আমার এই স্বল্প বুদ্ধি নিয়ে আমি উপদেশ দেবার মতো ধৃষ্টতা করব না—আমার অতিবিজ্ঞ হয়ে কাজ নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, উপদেশ দিয়ে যতটা না হোক, আলাপে আলোচনায় তার চেয়ে অনেক বেশি সহজে ভালোমন্দ কর্তব্যাকর্তব্য নির্ধারণ করা যায়। তোমার আমার মধ্যে অনেক কথা হয়েছে, তা বলে মনে কোরো না—সেই অতিবিজ্ঞের মতো—যা শেখবার মতো বা শেখবার তা শেখা হয়ে গেছে, জানা হয়ে গেছে। আমাদের এই বিস্তীর্ণ পৃথিবী ছাড়াও আরও কতসব আশ্চর্য জগৎ আছে— তাদের সম্বন্ধে শিখতে হলে, জানতে হলে কিন্তু অতিবিজ্ঞের মতো বড়াই করলে চলবে না। আমাদের অত বেশি জ্ঞান হয়ে কাজ নেই, কী বলো? তা হলে তো জ্ঞানের ভাণ্ডার ফুরিয়ে যাবে, আর নিত্য নূতন জিনিষ শেখার কিংবা নিত্য নূতন আবিষ্কার করবার আনন্দ আমরা আর পাব না।