কাজেই, অতিবিজ্ঞের মতো উপদেশ দিয়ে কাজ নেই। তা হলে কী করি, বলো? চিঠি যদি আলাপ হয় তবে তো সে হবে একতরফা। কাজেই যদি আমি এমন কিছু বলি যা সদুপদেশের মতো শোনায় তা হলে সেটাকে বিরক্তিকর ভেবো না। মনে কোরো, যেন তোমার সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে একটা প্রস্তাব উত্থাপিত করছি।
জাতির ইতিহাসে যুগপ্রবর্তনের কথা পড়েছ। ইতিহাসবিখ্যাত নরনারীদের মহত্বের কথা স্মরণ করে মাঝে মাঝে আমরা কল্পনা করি, সেই বীর ও বীরাঙ্গনাদের মতো আমরাও যেন সব বড়ো বড়ো কাজ করতে পারি। তুমি যখন ছোটো ছিলে তখন জোয়ান অব আর্ক-এর গল্প পড়ে ভেবেছ, কেমন করে তাঁর মতো হতে পারবে। সাধারণ মানুষ বীরত্বের ধার দিয়েও যায় না, নিজের নিজের সন্তানসন্ততি বাড়িঘরদোর নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এমনসব সময় আসে যখন বড়ো-একটা-কিছুর জন্যে উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এরাও অসাধারণ হয়ে পড়ে। বড়ো বড়ো নেতারা যখন জনসাধারণকে জাগিয়ে তোলেন তখন ইতিহাসে যুগপ্রবর্তন হয়।
১৯১৭ খৃষ্টাব্দে—যে সালে তোমার জন্ম—এইরকম একজন যুগপ্রবর্তক তাঁর কাজ আরম্ভ করেছিলেন। দুঃস্থ এবং দরিদ্রের জন্যে তাঁর হৃদয় প্রেমে ও করুণায় উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। ঠিক তোমার যে মাসে জন্ম সেই মাসেই যুগান্তকারী রুশ বিপ্লব ঘটেছিল এবং তার নেতা ছিলেন লেনিন। আজ আমাদের ভারতবর্ষে ঠিক তেমনি একজন নেতা আমরা পেয়েছি, যাঁর প্রেম ও সহয়তায় অনুপ্রাণিত হয়ে আজ প্রত্যেক ভারতবাসী স্বরাজ-সাধনার জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত। তেত্রিশ কোটি ভারতবাসী আজ তাঁর মহতী বাণী শুনেছে, যদিচ সেই বাপুজি আজ কারাগারে। তারা আজ তাদের সমস্ত ক্ষুদ্রতা ছেড়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। আমাদের মস্ত বড়ো সৌভাগ্য যে, আজ আমরা আমাদের চোখের সামনেই ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই যুগপ্রবর্তনের সূচনা দেখতে পাচ্ছি।
এই বিরাট আন্দোলনে আমাদের উপর কী কর্তব্যভার পড়বে সে আমি জানি না; শুধু এইটকু জানি যে, আমাদের স্বরাজ-সাধনা এবং আমাদের দেশ যাতে আমাদের দ্বারা লাঞ্ছিত ও অবমানিত না হয়, সেটুকুর প্রতি আমাদের দৃষ্টি রাখা উচিত। যদি ভারতের মুক্তিসেনা হতে চাই তবে মনে রাখতে হবে যে ভারতের সম্মান আমাদের হাতে গচ্ছিত রয়েছে এবং প্রাণ দিয়েও তাকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে হবে। অনেক সময় আমরা হয়তো আস্থা হারাব, আমাদের পক্ষে কী যে শ্রেয় সে সম্বন্ধে বহু সন্দেহ আসবে। এইরকম দোটানায় ও সংকটের সময় মনে রাখতে হবে, আমরা এমন কিছু যেন কখনও না করি যার জন্যে আমাদের একদিন লজ্জা পেতে হবে, এমন কিছু যেন না করি যা লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপন রাখতে হবে। গোপন করার চেষ্টা ভীরুর—সে চেষ্টা ভারতের মুক্তিসেনার অযোগ্য। মনের সাহস ও হৃদয়ের বলই হল সবচেয়ে বড়ো ভরসা, বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে এই সাহস অবলম্বন করতে হবে। বাপুজির নেতৃত্বে আমরা যে এই স্বরাজ আন্দোলন করছি এর মধ্যে লুকোচুরি বা ভয়ের তো কিছু নেই। প্রত্যক্ষ দিবালোকে আমরা আমাদের কর্তব্য করে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত জীবনেও যদি আমরা আলোকে ভয় না করি, তবে দেখবে যে কোনো কিছুই আমাদের চিত্তবিক্ষেপ ঘটাতে পারবে না।
দেখেছ, কী মস্ত লম্বা চিঠি হয়ে গেল! তবু তোমাকে বলার মতো কথা যেন ফুরোয়ই না, সামান্য চিঠিতে কতটুকুই-বা বলা যায়?
বলেছি তো তোমায়, এ তোমার পরম সৌভাগ্য যে এদেশের সেই বিরাট স্বাধীনতা-সংগ্রাম নিজে দেখতে পাচ্ছ। তোমার পক্ষে আরও ভাগ্যের কথা যে, তুমি এমন জননী পেয়েছ যিনি ক্ষীণকায়া হলেও খুব তেজম্বী ও চমৎকার। কোনোরূপ বিপদ বা সংকট উপস্থিত হলে তাঁর চেয়ে সত্যিকার বন্ধু তুমি আর কোথাও পাবে না।
এবার শেষ করি। আশা করি বড়ো হয়ে তুমিও ভারতের একজন মুক্তিসেনা হবে।