১
নববর্ষের উপহার
নববর্ষের প্রথম দিন, ১৯৩১
মনে আছে তোমার, দু বছর আগে আমি যখন এলাহাবাদে ছিলাম আর তুমি ছিলে মুসৌরিতে, তখন তোমাকে কতগুলি চিঠি পাঠিয়েছিলাম। সেগুলি তোমার নাকি ভালো লেগেছিল। তার পর থেকে আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, আমাদের এই পৃথিবী সম্বন্ধে ওই পর্যায়ের অনুসারী আরও কিছু তোমায় লিখব কি না। কেমন যেন দ্বিধা হয়েছিল এই সেদিনও। পুরোনোকালের ইতিহাস, বীর ও বীরাঙ্গনাদের কাহিনী পড়তে খুব ভালো লাগে, না? কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক ভালো হয় যদি আমরা ইতিহাস-গঠনে সাহায্য করি আমাদের নিজেদের কর্তব্য করে। বলেছি তো তোমায়, আমাদের দেশের ইতিহাসে একটা নূতন যুগ আরম্ভ হয়েছে। ভারতের অতীত অতি পুরাতনের আবছায়া কুয়াশায় আবৃত; কতশত শতাব্দী, কত হাজার বছর আগে যে আমাদের ইতিহাসের শুরু সে আমরাই ঠিক বলতে পারি নে। ভারতের অতীত ইতিহাসের কলঙ্কের কথা স্মরণ করলে আমাদের লজ্জিত ও দুঃখিত হতে হয়; তবু মোটামুটি ধরলে বোঝা যায় যে আমাদের অতীতগৌরবও কম ছিল না। সেই গৌরবময় অতীতদিনের স্মৃতি এখনও আমাদের গর্বের জিনিষ। আজ কিন্তু পুরাতনের কথা মনে করে সময়ক্ষেপ করলে আমাদের চলবে না। যে বর্তমানের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি এবং যে ভবিষ্যৎকে আমরা গড়ে তুলছি তার কথাই আজ আমাদের মনে রাখতে হবে।
তোমাকে যা লিখব ভেবেছিলাম সে সম্বন্ধে নাইনি জেলে বসে অনেক মালমশলা সংগ্রহ করেছি অবশ্য, তবু মন আমার কিছুতেই বসতে চায় না; কেবলই ভাবি বাইরের বিরাট আন্দোলনের কথা, ভাবি, বাইরের লোকেরা স্বরাজ-সাধনায় যে কর্তব্য করছে তাই আমিও করতাম আজ তাদের সঙ্গে থাকলে। বর্তমানের সব ঘটনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমার সমস্ত মনটাকে জুড়ে আছে। তাই আর অতীতের কথা ভাববার সময় নেই। বুঝি অবশ্য যে, বাইরের কাজে যোগ দিতে পারব না, সুতরাং এভাবে বিচলিত হওয়া আমার পক্ষে উচিত নয়।
কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই ধরনের চিঠি লিখি নি কেন তার সত্যি কারণটা বলি শোনো। আমার এখন ভাবনা হচ্ছে, আমি কতটুকুই বা জানি যার বলে তোমাকে শিক্ষা দেব। বুদ্ধিতে এবং মাথায় তুমি এমন চটপট বড়ো হয়ে উঠছ—আমি স্কুল-কলেজে এবং তার পরেও যত পড়াশোনা করেছি তা হয়তো তোমার পক্ষে অতিসামান্য কিংবা অতিসাধারণ মনে হতে পারে। আরও কিছুদিন পরে তুমিই হয়তো শিক্ষক হয়ে অনেক নতুন নতুন জিনিষ শেখাবে আমাকে! কেমন? তোমার জন্মদিনে লেখা চিঠিটাতে লিখেছি-না যে অতিবিজ্ঞের মতো আমার অত জ্ঞান নেই যে বিদ্যে ফেটে বেরিয়ে পড়বার ভয়ে বর্ম এঁটে রাখতে হবে!
পৃথিবীর একেবারে প্রাচীনকালের ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয় বলে সে সম্বন্ধে যা তোমাকে লিখেছিলাম তার জন্যে আমার খুব বেগ পেতে হয় নি। কিন্তু যেই আমরা অতিপুরাতনের খোলস ছেড়ে সত্যিকার ইতিহাসের সূচনায় আসি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহাদেশে বিভিন্ন সভ্যতার পরিব্যাপ্তি দেখতে আরম্ভ করি, তখন শতসহস্র ঘটনার সংঘাত মানবসমাজের বিচিত্র পরিণতির নানাবিধ খুঁটিনাটির মধ্যে পড়ে, বুদ্ধি যেন পথ হারিয়ে ফেলে। বই পড়ে অবশ্য অনেক সাহায্য পাওয়া যায়, কিন্তু নাইনি জেলে তো সে সুবিধে নেই। কাজেই পৃথিবীর ইতিহাসের একটা ধারাবাহিক বিবরণ আশা কোরো না আমার কাছ থেকে। ছেলেমেয়েরা যখন সন তারিখ মুখস্থ করে বিশেষ কোনো-একটি দেশের ইতিহাস আয়ত্ত করতে চায়, তখন আমার ভারি দুঃখ হয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ আছে সেটাকে উপেক্ষা করলে ইতিহাস টেঁকে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি ওরকম বিশেষ একটা কি দুটো দেশের ইতিহাস পড়তে যাবে না—ওটা ভুল। সমস্ত