পৃথিবীর ইতিহাস বিভিন্ন দেশের সম্বন্ধে পরম্পরাক্রমে আমাদের দেখে নিতে হবে। মনে রেখো যে জাতে জাতে এবং দেশে দেশে যে বৈষম্যটকু আছে বলে আমরা মনে করি তা সব সময়ে সত্যি নয়। মানচিত্রে এবং ভূপরিচয়ে আমরা সাধারণত নানান দেশ নানান রঙে রঞ্জিত দেখি—মানুষে মানুষে ওইরকম বৈষম্য আছে, কিন্তু মিলও আছে। কাজেই সীমারেখা আর মানচিত্রের নজির অনুসারে চললে আমরা অনেক সময় ভুল করব।
আমি যে ধরনের ইতিহাস পছন্দ করি সেইরকমটি লেখা আমার আয়ত্তের অতীত—তার জন্যে তোমার অন্য বই পড়তে হবে। তবু মাঝে মাঝে তোমাকে অতীতের কাহিনী এবং পুরাকালের প্রখ্যাতনামা লোকদের কথা শোনাবার ইচ্ছে রাখি।
আমার চিঠিগুলো তোমার মনে আরও জানবার ইচ্ছে জাগিয়ে দেবে কি না বা আদৌ তোমার ভালো লাগবে কি না, সে আমার জানা নেই। সেগুলো তোমার কাছে পৌঁছবে কি না সে সম্বন্ধেও আমার সন্দেহ আছে। মুসৌরিতে যখন ছিলে তখন সত্যিই বেশ কিছুটা ব্যবধান ছিল, এখন তুমি কাছেই রয়েছ অথচ যেন কতশত যোজন দূরে। তোমার কাছে তখন খুশিমতো চিঠি পাঠাতে পারতাম, আর খুব বেশি ইচ্ছে হলে তোমাকে দেখে আসাও সম্ভবপর ছিল। আজ আমাদের মাঝখানে কেবল যমুনা নদীর ব্যবধান, তবু নাইনি জেলের প্রাচীর তোমায় যেন কত দূরে সরিয়ে রেখেছে। চোদ্দ দিন অন্তর তোমার কাছে চিঠি লেখার অনুমতি পাই, দীর্ঘ চোদ্দ দিনের পর তোমার একটুখানি দেখা মেলে কেবল মিনিট কুড়ির জন্যে! তবু এ ব্যবস্থা যেন ভালোই—যা আমরা সহজে পাই তার মর্যাদা আমরা খুব কমই রাখি। তাই আমার মনে হয় যে কিছুদিনের জন্যে কয়েদখানায় বন্দী থাকা—শিক্ষারই একটা বিশিষ্ট অঙ্গ হওয়া উচিত। সুখের বিষয়, আমার দেশবাসী ভাইবোনেরা আজ অনেকেই এ শিক্ষা পাচ্ছে।
বলেছি তো, আমার ভয় আছে পাছে এ চিঠিগুলো তোমার ভালো না লাগে। তবু কী জানো, এ লিখছি আমি নিজেরই একটু আনন্দের জন্যে—চিঠির ভিতর দিয়ে মনে হয় তোমার যেন নাগাল পাচ্ছি, যেন তোমার সঙ্গে আমার আলাপ চলছে। প্রায়ই তোমার কথা ভাবি। আজকে তো বিশেষ করেই তোমার কথা মনে হচ্ছে। আজ নববর্ষের প্রথম দিন। খুব ভোরবেলায় আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে মনে হল পুরোনো বছরের আশা-আনন্দ-দুঃখ-দুরাশায়-মেশা আমাদের দিনগুলোকে। মনে হল, কী যেন যাদুমন্ত্রে বাপুজি যারবেদা জেল থেকে আমাদের জীর্ণ জাতীয়-জীবনে নূতন যৌবনের সঞ্চার করেছেন; তোমার দাদু এবং আরও অনেকের কথাও মনে হয়েছিল। বিশেষ করে ভাবছিলাম তোমার আর তোমার মার কথা; ইতিমধ্যে শুনলাম যে তোমার মাকে ওরা ধরে কয়েদখানায় আটকে রেখে দিয়েছে। নিশ্চয় উনি খুব খুশি হয়েছেন। আজ আমি যেরকম নববর্ষের উপহার চেয়েছিলাম ঠিক তেমনটি পেয়েছি।
তুমি বড়োই একলা পড়ে গেলে—না? প্রতি চোদ্দ দিন অন্তর তোমার মার সঙ্গে আর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তো তোমার—তখন উভয়পক্ষের বার্তাবহ হয়ে উঠবে তুমি। যে দিনগুলো অমনি অমনি কাটবে সেই সেই দিনেও চিঠি লিখতে লিখতে তোমার কথা ভাবব। কল্পনায় দেখব, তুমি বসেছ আমার পাশে, কতরকম আলাপ হচ্ছে তোমার আমার মধ্যে। দুজনে মিলে আমরা সেই পরাকালের স্বপ্ন দেখব আর ভাবব যে ভবিষ্যৎকে যেন অতীতের চেয়েও বড়ো করে গড়তে পারি আমরা। আজ নববর্ষের প্রথম দিনটাতে এসো আমরা দুজনে সাহস করে বলি যে, এ বছরও যেদিন পুরোনো হয়ে পড়বে সেদিন হিসেব মিলিয়ে দেখতে পাব যে এ বছরটা বৃথা অতিবাহন করি নি। ভারতের অতীত গৌরবের ইতিহাসে এ যেন একটা বিশিষ্ট স্থান পায়, যেন এ বছরটি আমাদের ভবিষ্যতের সেই স্বপ্নকে সার্থকতার পথে এগিয়ে দিতে পারে।