বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/২৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ

 আমাদের একখানি প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে একটি শ্লোক আছে যার অনুবাদের সারমর্ম এরূপ: ‘পরিবারের জন্য ব্যক্তিকে, সমাজের জন্য পরিবারকে, দেশের জন্য সমাজকে এবং আত্মার জন্য সমগ্র জগৎকে বর্জন করবে।’ আত্মা যে কী বস্তু তা আমাদের মধ্যে অল্প লোকেই জানে বা বলতে পারে এবং আমাদের প্রত্যেকেই একে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু এই সংস্কৃত শ্লোক থেকে আমরা পরস্পর সহযোগিতা ও বৃহত্তর কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগের শিক্ষাই লাভ করছি। আমরা ভারতবাসীরা অনেকদিন আগেই প্রকৃত মহত্ত্বের এই প্রকৃষ্ট পন্থার কথা ভুলে গিয়েছিলাম, তাই আমাদের পতন হয়েছে। কিন্তু পুনরায় যেন এর কিছুটা দৃষ্টিগোচরে আসছে এবং সারা দেশে চঞ্চলতার সাড়া জেগে উঠছে। স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বালিকার দল নিজ নিজ দুঃখকষ্টের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে স্মিতহাস্যে দেশের কাজে অগ্রসর হচ্ছে। কী চমৎকার দৃশ্য! তাদের স্মিতহাস্য ও আনন্দের একটা সংগত কারণ আছে, যেহেতু একটা মহৎ কার্যে যোগদান করার আনন্দের তারা অধিকারী; এবং যারা ভাগ্যবান তারাই শুধু আত্মত্যাগের আনন্দ লাভ করতে সক্ষম। আজ আমরা ভারতকে স্বাধীন করতে চেষ্টা করছি; এটাও একটা বড়ো কাজ। কিন্তু সার্বভৌম মানবতার আদর্শ এর চেয়েও বড়ো। এবং যেহেতু আমরা উপলব্ধি করি যে আমাদের সংগ্রাম হল দুঃখ-দারিদ্রের অবসানের জন্য বিশ্বমানবের বিরাট সংগ্রামের অংশবিশেষ মাত্র, তাই আমরা এই ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারি যে, দুনিয়ার অগ্রগতিতে আমরাও কিঞ্চিৎ সাহায্য করছি।

 ইতিমধ্যে তুমি থাকবে আনন্দভবনে, এবং তোমার মা থাকবে মালাক্কা বন্দীনিবাসে, আর আমি এই নাইনি জেলে; এবং কেউ কারও দর্শন পাব না—নয় কি? কিন্তু একবার ভাবো তো সে দিনটির কথা, যেদিন আমাদের তিনজনের আবার মিলন হবে। আমি সেই দিনটির প্রতীক্ষা করে থাকব, এবং এই কল্পনাই আমার মনকে হাল্কা আর উৎফুল্ল করে তুলবে।


‘ইন্‌কিলাব জিন্দাবাদ’

৭ই জানুয়ারি, ১৯৩১

 চোখের সামনে যখন থাকো তখন তুমি প্রিয়দর্শিনী। চোখের আড়ালে রয়েছ বলে তোমায় যেন আরও বেশি করে ভালো লাগে।

 আজ তোমাকে চিঠি লিখতে বসে মনে হল, সুদূর মেঘগর্জনের মতো যেন বহু কণ্ঠের একটা অস্ফুটে গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি। প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারি নি, শুধু মনে হল শব্দটা যেন চেনা-চেনা, যেন বুকের মধ্যে তার অনুরণন বাজছে। জনতা নিকটতর হলে কথাগুলোও স্পষ্টতর হল, আর বুঝতে বাকি রইল না। ‘ইন্‌কিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে সমস্ত কারাগার মুখর হয়ে উঠল। মনটা খুশিতে ভরে উঠল। আমাদের এত কাছাকাছি, কারাপ্রাচীরের ঠিক অপর পাশেই কারা যে বিপ্লবের বাণী ঘোষণা করে চলে গেল জানি না। হয়তো তারা এই শহরেরই লোক, হয়তো তারা গাঁ থেকে এসেছে—কৃষকের দল। নাই-বা জানলাম ওরা কোথাকার লোক—ওদের ওই নূতন যুগের আবাহনমন্ত্রে আমাদের সমস্ত মন যেন নীরবে সাড়া দিল।

 ‘ইন্‌কিলাব জিন্দাবাদ’ এই বাণীর অর্থ কী? কেনই-বা আমরা বিপ্লব চাই? ভারত আজ অনেক কিছু নূতন করে গড়তে চায়। যে বিরাট পরিবর্তন আমরা আনতে চাই তা যখন সার্থক হবে, যখন আমরা স্বরাজ পাব, তখনও কিন্তু আমাদের চুপচাপ বসে থাকা চলবে না। প্রাণবস্তু যা-কিছু, তার ক্রমাগত অদলবদল ঘটছে। সমস্ত প্রকৃতি প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে নিত্যনূতন হয়ে