প্রভৃতি দেশের ধর্মগুরু বুদ্ধেরও জন্মস্থান এই ভারতে। ইহুদি ও খৃষ্টীয় ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল প্যালেস্টাইনে—এশিয়ার পশ্চিম উপকূলে। পার্শিরা যে জরথুস্ট্রের ধর্মে বিশ্বাস করে তার সূচনা হয়েছিল ইরানে, ইসলামের পয়গম্বর মহম্মদ জন্মেছিলেন আরব দেশের মক্কাশরীফে। কৃষ্ণ বুদ্ধ জরথুস্ট্র খৃষ্ট মহম্মদ, চীনের দার্শনিকশ্রেষ্ঠ কনফুসিয়স ও লাওৎসে—কত যে দার্শনিক ও তত্ত্বজ্ঞানী এ দেশে জন্মেছেন তার ইয়ত্তা নেই। পাতার পর পাতা লিখে গেলেও এশিয়ার জ্ঞানবীর ও কর্মবীরদের নামের তালিকা নিঃশেষ হয়ে যাবে না। এ ছাড়া, আরও কতভাবে এশিয়া যে পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে সে কথা বলে শেষ করা যায় না।
সে দিন আর নেই। আমাদের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি কালের সঙ্গে সঙ্গে কত অদলবদল-ওলটপালট ঘটে যাচ্ছে। সচরাচর অবশ্য ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দীতে মন্থরগতিতে চলে। অপর কোনো হিসাব উল্টে দেবার জন্যই যেন সময় সময় ছোটে ঊর্দ্ধশ্বাসে, বিপর্যয় ঘটে যায়। আজ এই মন্থর এশিয়া মহাদেশ তার বহু দিনের তন্দ্রা ভেঙে আবার জেগে উঠছে। সমস্ত পৃথিবী আজ তাকিয়ে আছে এশিয়ার দিকে। সবাই জানে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ইতিহাসে অনেকখানি জায়গা জড়ে থাকবে এশিয়া।
৫
প্রাচীন সভ্যতা ও আমাদের উত্তরাধিকার
৯ই জানুয়ারি, ১৯৩১
‘ভারত’ বলে যে হিন্দি সংবাদপত্রখানা সপ্তাহে দুবার আমাদের বাইরের জগতের খবর এনে দেয় তাতে গতকাল পড়লাম যে, মালাক্কা জেলে তোমার মায়ের ঠিকমতো যত্ন হচ্ছে না। আর শীগগিরই নাকি ওকে লক্ষ্ণৌ জেলে পাঠানো হচ্ছে। পড়ে একটু দমে গেলাম, একটু উদ্বিগ্ন হলাম। হয়তো ‘ভারত’-এর গুজব সত্যি নয়। তবু সন্দেহও ভালো লাগে না। নিজের কষ্ট অসুবিধা সহ্য করা শক্ত নয়। ওতে ফল ভালোই হয়, ও না হলে আমরা অতিরিক্ত নরম হয়ে পড়তে পারি। কিন্তু আমাদের প্রিয়জনের দুঃখকষ্টের কথা ভাবা সহজও নয়, আরামপ্রদও নয়—বিশেষ, আমরা যদি কোনো সাহায্যই না করতে পারি। তাই ‘ভারত’ আমার মনে সংশয় ঢুকিয়ে তোমার মায়ের সম্বন্ধে আমায় উদ্বিগ্ন করে তুলল। ওর সাহস আছে, আছে সিংহীর মতো মনের জোর, কিন্তু দেহে ও দুর্বল; ও আরও দুর্বল হয়ে পড়ুক, এ আমি চাই না। যতই বুকের পাটা থাক না কেন, শরীর যদি ভেঙে পড়ে তো আমরা কী-ই বা করতে পারি? কোনো কাজ যদি ভালোভাবে করতে হয় তবে আমাদের স্বাস্থ্য চাই, শক্তি চাই, চাই সুঠাম শরীর।
হয়তো লক্ষ্ণৌ পাঠালে তোমার মায়ের ভালোই হবে। সেখানে আর-একটু আরাম আর আনন্দ পেতে পারে, আর লক্ষ্ণৌ জেলে কিছু সাথিও জুটবে। মালাক্কায় বোধহয় ও একেবারে একা। তবু ভেবে মন্দ লাগত না যে, আমাদের জেল থেকে ও মাত্র চার-পাঁচ মাইল দূরে আছে। কিন্তু এ তো অর্থহীন কল্পনা! কারাকক্ষের উঁচু পাঁচিল যখন মাঝখানে তখন পাঁচ মাইল ও যা, এক শো পঞ্চাশ মাইলও তাই।
‘দাদু’ এলাহাবাদে ফিরে এসেছেন এবং একটু ভালো আছেন জেনে আজ খুব আনন্দ হল। আরও আনন্দ হল জেনে যে উনি তোমার মাকে দেখতে মালাক্কা জেলে গিয়েছিলেন। বরাতে থাকলে হয়তো কাল তোমাদের সবাইকে আমি দেখতে পাব, কারণ কাল আমার দেখা করবার দিন, আর জেলে ‘মুলাকাৎ-কা দিন’ তো মস্ত দিন! প্রায় দু মাস আমি ‘দাদু’কে দেখি নি। আশা করি, তাঁকে দেখব, নিজের চোখে দেখে তৃপ্তি পাব যে, তিনি একটু সেরে উঠেছেন। আর তোমারও দেখা পাব সুদীর্ঘ পক্ষকাল বাদে, তুমি তোমার আর তোমার মায়ের খবর আমায় এনে দেবে।