আরে! তোমাকে লিখতে বসেছিলাম অতীতের ইতিহাস, আর কীসব আজেবাজে ব্যাপার লিখে যাচ্ছি। এসো, বর্তমানকে ভুলে গিয়ে, দু-তিন হাজার বছর পিছিয়ে যাই।
আগের কোনো কোনো চিঠিতে আমি তোমাকে মিশরের আর ক্রীটদ্বীপে প্রাচীন নোসসের কথা লিখেছি। আর বলেছি যে, প্রাচীনকালের সভ্যতা এ দুটি দেশ ছাড়াও শিকড় গেড়েছিল আজকের ইরাক বা মেসোপটেমিয়ায়, চীনে, ভারতবর্ষে আর গ্রীসে। গ্রীসের সভ্যতা খুব সম্ভব এদের একটু পরবর্তী। তা হলে ভারতবর্ষের সভ্যতা বয়সের দিক দিয়ে মিশর, চীন আর ইরাকের সহোদরসভ্যতার পাশে স্থান নিতে পারে। প্রাচীন গ্রীসও এদের ছোটো বোন। এইসব প্রাচীন সভ্যতার কী হল? নোসস আর নেই। তিন হাজার বছর হল তার বিলয় ঘটেছে। কনিষ্ঠ সভ্যদেশ গ্রীসের লোকেরা এসে তাকে ধ্বংস করেছে। মিশরের প্রাচীন সভ্যতা হাজার হাজার বছরের বিস্ময়কর ঐতিহ্যের পর মিলিয়ে গেল—বিশাল পিরামিড স্ফিঙ্ক্স্, মন্দির আর মমিদের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কোনো চিহ্নই রইল না তার। মিশর দেশটা অবশ্য আজও আছে, সেকালের মতোই নীলনদ তার মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে, অন্য দেশের মতোই সেখানে নরনারীর বাস। কিন্তু আজকের এই মানুষগুলির সঙ্গে ও দেশের সেই অতীত গৌরবের আর কোনো যোগ নেই।
ইরাক আর —কত সাম্রাজ্যই না ওখানে গড়ে উঠেছে আর পরস্পরকে অনুসরণ করেছে চিরবিলুপ্তির পথে! শুধু যদি প্রাচীনতমগুলির নামই ধরা যায় তা হলেও কত—বাবিলনিয়া, আসিরিয়া, কল্ডিয়া। বাবিলন আর নিনেভে-র সেই মহানগরী! বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেণ্ট ভর্তি তো এদেরই কাহিনী। আরও পরে, প্রাচীন ইতিহাসের যুগে আরও অনেক সাম্রাজ্য ওখানে গড়ে উঠেছে, আবার ধূলোয় লুটিয়েছে। ওখানে একদিন ছিল বোগ্দাদ—আরব্যোপন্যাসের সেই যাদুশহর! কিন্তু সাম্রাজ্য ওঠে আর পড়ে, রাজামহারাজাদের মধ্যে মহামহীয়ান যারা, পৃথিবীর নাটমঞ্চে তাদের ঘোরাফেরাও খুব ক্ষণিকের জন্যে। তবু সভ্যতা বেঁচে থাকে। ইরাক আর পারশ্যের সভ্যতা অবশ্য মিশরেরই মতো নিঃশেষে লোপ পেয়েছিল।
অতীত যুগে গ্রীসের সত্যিই গরিমা ছিল—আজও লোকে সবিস্ময়ে সে গৌরবকাহিনী পড়ে। তার মর্মরমূর্তির সামনে আমরা নির্বাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তার পুরোনো সাহিত্যের যেটুকু আমাদের কাছে এসেছে সেটুকু শ্রদ্ধার সঙ্গে মুগ্ধ হয়ে পড়ি। যথার্থই বলা হয়েছে যে, নব্য ইউরোপ কোনো কোনো দিক দিয়ে প্রাচীন গ্রীসেরই সন্তান; গ্রীক চিন্তাধারা, গ্রীক প্রথা এতই প্রভাবিত করেছে ইউরোপকে। কিন্তু গ্রীসের সে গৌরব আজ কোথায়? বহু যুগ হল সে প্রাচীন সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, নতুন প্রথা দেখা দিয়েছে—গ্রীস আজ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে এক ক্ষুদ্র দেশ মাত্র।
মিশর, নোসস, ইরাক, গ্রীস—সব চলে গেছে। বাবিলন আর নিনেভে-র মতো তাদের অতীত সভ্যতাও আজ অস্তিত্বহীন। আর এই পুরোনো সভ্যতার দলের অন্য দুটি প্রাচীন দেশ? চীন আর ভারত? অন্যান্য দেশের মতো সেখানেও সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য গড়েছে এবং ভেঙেছে। আক্রমণ, ধ্বংস, লুঠতরাজ হয়েছে খুব বড়ো হারে। শত শত বছর ধরে এক রাজার বংশ শাসন করেছে, আবার অন্যে এসে তাদের জায়গা নিয়েছে। অন্যসব জায়গার মতো চীন আর ভারতেও এসব ঘটেছে। কিন্তু চীন আর ভারত ছাড়া আর কোথাও সভাতার একটা প্রকৃত অবিচ্ছিন্নতা দেখা যায় নি। সমস্ত পরিবর্তন, যুদ্ধবিগ্রহ, আক্রমণ সত্ত্বেও এই দুটি দেশেই প্রাচীন সংস্কৃতির সূত্র একটানা চলেছে। এ কথা ঠিক যে, দুটি দেশই তাদের অতীত গৌরব থেকে অনেক নেমে গেছে, আর অতীতের সেই সংস্কৃতি সুদীর্ঘ যুগযুগান্তরের পুঞ্জীভূত ধূলোয় আবর্জনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে; কিন্তু তবু তারা টিঁকে আছে, আর ভারতের সেই প্রাচীন সভ্যতাই আজকের ভারতীয় জীবনধারার ভিত্তিস্বরূপ। আজকের পৃথিবীতে হাওয়াবদল হয়েছে। বাষ্পজাহাজ, রেলপথ আর প্রকাণ্ড কারখানায় পৃথিবীর চেহারার পরিবর্তন ঘটেছে। হয়তো, হয়তো কেন খুবই সম্ভবত, ভারতবর্ষের চেহারাও বদলে যাবে, বদলে যাচ্ছেও ক্রমশ। কিন্তু ইতিহাসের ঊষা থেকে সোজা আমাদের যুগ পর্যন্ত ভারতীয় সভ্যতা আর সংস্কৃতির যে বিশাল পরিপ্রেক্ষিত ও অবিচ্ছিন্নতা, এর কথা ভাবতেও কৌতূহল জাগে, চমৎকৃত হতে হয়। একদিক দিয়ে আমরা ভারতীয়েরা এই বহু সহস্র বছরের উত্তরাধিকারী।