বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/২৯

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
হেলাসের অধিবাসী
১১

একলা যাঁরা উত্তর-পশ্চিম গিরিপথ দিয়ে এই ব্রহ্মাবর্ত বা আর্যাবর্ত বা ভারতবর্ষ বা হিন্দুস্থানের সূর্যহসিত সমভূমিতে এসেছিলেন, আমরা তাঁদেরই সন্ততি। পাহাড়ে পথ বেয়ে তাঁরা নীচের অজানা ভূমিতে দলে দলে নেমে আসছেন, দেখতে পাও না? বীর তাঁরা, দুঃসাহসের তেজে পূর্ণপ্রাণ, পরিণামের ভয় না করে এগিয়ে এসেছিলেন। মত্যু এলে পরোয়া করতেন না তাঁরা, হাসিমুখে বরণ করে নিতেন তাকে। কিন্তু জীবনকে তাঁরা ভালোবাসতেন, জানতেন যে জীবনকে ভোগ করা যায় একমাত্র নির্ভয় হলে, পরাজয় দুর্দৈব নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে চলে না। যারা ভয়হীন, পরাজয়-দুর্দৈব তাদের থেকে কেন জানি তফাতে থাকে। ভাবো তাঁদের কথা, আমাদের সেই বহু দূরের পূর্বপুরুষ যাঁরা, অভিযানের পথে সহসা তাঁরা সাগরগামী পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে এসে উপনীত হলেন। না জানি সে দৃশ্য তাঁদের কত উৎফুল্ল করে তুলেছিল। নত হয়ে তাঁরা যে তাঁদের সুললিত ব্যঞ্জনাময় ভাষায় তার প্রশস্তি গেয়েছিলেন তাতে আর আশ্চর্য কী!

 সত্যই বিস্ময় জাগে যে আমরাই সেইসব যুগের উত্তরাধিকারী। কিন্তু দম্ভ করা উচিত নয়, কারণ সে যুগের ভালো মন্দ, দুয়েরই উত্তরাধিকার আমরা পেয়েছি। আর আজকের ভারতে বহু মন্দ জিনিষ রয়ে গেছে, যা বিশ্বে আমাদের নীচু করে রেখেছে, আমাদের মহান্ দেশকে নিদারুণ দরিদ্র করে ফেলেছে, অন্যের হাতের পুতুল করে তুলেছে। কিন্তু আমরা কি স্থির করে ফেলি নি যে এ আর চলবে না?


হেলাসের অধিবাসী

১০ই জানুয়ারি, ১৯০১

 তোমরা কেউ আজ আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলে না, ‘মুলাকাৎ-কা দিন’ প্রায় ফাঁকাই গেল। হতাশ হতে হল। আরও খারাপ হচ্ছে দেখা করবার দিন পিছিয়ে দেবার কারণটি। আমাদের বলা হল যে দাদু অসুস্থ। আর কিছু জানবার ক্ষমতা আমাদের নেই। তা, যখন জানলাম যে দেখাসাক্ষাৎ আজ আর হবে না, আমি আমার চরখা নিয়ে কিছু সুতো কাটলাম। দেখছি যে চরখা কাটলে আর নেওয়ার বুনলে বেশ সান্ত্বনা পাওয়া যায়। অতএব, যখনই মনে সংশয় জাগবে, সুতো কেটো।

 আগের চিঠিতে আমরা ইউরোপ আর এশিয়ার সাদৃশ্যে ও পার্থক্য দেখিয়েছিলাম। এবার এসো সে সময় প্রাচীন ইউরোপ যেমন ছিল বলে কল্পনা করা হয়, সেদিকে একবার দৃষ্টিপাত করি। বহুকাল যাবৎ ইউরোপ বলতে বোঝাত ভূমধ্যসাগরের চতুর্দিকের দেশগুলি। জর্মান, ইংলণ্ড আর ফরাসি দেশে বন্য বর্বর জাতির বাস বলে মনে করত ভূমধ্যসাগরবর্তীরা। প্রথম প্রথম শুধু ভূমধ্যসাগরের পূর্ব-অঞ্চলগুলিকেই সভ্যতার কেন্দ্র বলে ধরা হত। জানোই তো যে, মিশর (অবশ্য এ দেশ ইউরোপে নয়, আফ্রিকায়) আর নোসসই ছিল এদের অগ্রণী। ধীরে ধীরে আর্যরা এশিয়া থেকে পশ্চিমদিকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রীস এবং পাশের অন্যান্য দেশ আক্রমণ করল। এরাই হচ্ছে সেই আর্যগ্রীক যাদের আমরা প্রাচীন গ্রীক বলে জানি এবং সম্মান করি। গোড়ার দিকে এদের থেকে ভারতীয় আর্যদের বোধহয় খুব তফাত ছিল না। কিন্তু পরে নিশ্চয় পরিবর্তন ঘটেছিল, ফলে আর্যজাতির এ দুই শাখা ক্রমশ ভিন্ন হয়ে গেল। ভারতীয় আর্যদের উপর প্রভাব পড়ল ভারতবর্ষের প্রাচীনতর সভ্যতার—দ্রাবিড় সভ্যতার, যার ভগ্নাবশেষ আমরা মোহেঞ্জোদারোতে দেখতে পাই। দ্রাবিড় আর আর্যরা পরস্পরকে দিয়েছিল অনেক, পরস্পরের থেকে নিয়েওছিল অনেক, ফলে এক সাধারণ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। ঠিক এমনিভাবেই আর্যগ্রীকরা তখনকার গ্রীসে বিকাশমান নোসসের প্রাচীনতর সভ্যতার ধারা প্রভাবিত হয়েছিল। কিন্তু তা হলেও তারা নোসস ও তার