বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ - জওহরলাল নেহরু - সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯৫১).pdf/৩১

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
হেলাসের অধিবাসী
১৩

সভ্যতার অনেকখানিই ধ্বংস করে সেই ভগ্নস্তূপের উপর তাদের আপন সভ্যতাকে খাড়া করে তুলেছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সেকালে আর্যগ্রীক ও ভারতীয় আর্যরা ছিল রুক্ষ কঠোর যোদ্ধার জাত। শক্তিমান তারা, দুর্বলতর জাতিকে হটিয়ে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিত।

 অতএব, খৃষ্ট জন্মাবার এক হাজার বছর আগে নোসস ধ্বংস হল। আর নবাগত গ্রীকরা গ্রীস ও তার চতুর্দিকের দ্বীপপুঞ্জে আস্তানা গাড়ল। সাগরপথে তারা গেল এশিয়া মাইনরের পশ্চিমকূলে, দক্ষিণ-ইতালি ও সিসিলিতে, এমনকি ফরাসি দেশেরও দক্ষিণে। ফরাসি দেশে মার্সেই শহরের প্রতিষ্ঠা তাদেরই হাতে। কিন্তু তারা ওখানে যাবার আগেও বোধহয় ওখানে ফিনিশীয়দের বসতি ছিল। তোমার মনে আছে যে, ফিনিশীয়রা এশিয়া মাইনরের নাবিক জাত, বাণিজ্যের জন্যে দূরদূরান্তরে যেত। সেই আদিযুগে, ইংলণ্ড যখন বর্বর ছিল, তখনই তারা ইংলণ্ডে যাতায়াত করত—জিব্রাল্‌টার প্রণালী দিয়ে তাদের সুদীর্ঘ সিন্ধুযাত্রা নিশ্চয় দুর্গম ছিল।

 গ্রীসের ভূখণ্ডে প্রসিদ্ধ নগর সব গড়ে উঠল—এথেন্‌স্, স্পার্টা, থীব্‌স্, করিন্থ। গ্রীকরা, অথবা যে নামে তাদের ডাকা হত, হেলীন্‌রা, তাদের প্রথম দিনগুলিকে অমর করে রেখে গেল তাদের দুটি প্রখ্যাত মহাকাব্যে—ইলিয়াড ও অডিসী-তে। এ দুটি কাব্য সম্বন্ধে তুমি কিছ জানো—আমাদের রামায়ণ ও মহাভারতের সঙ্গে এক বিষয়ে এদের মিল আছে। কথিত আছে, এ দুখানি অন্ধ হোমরের রচনা। ইলিয়াড আমাদের শোনায়, কেমন করে প্যারিস রূপসী হেলেন্‌কে তাঁর ট্রয় শহরে হরণ করে নিয়ে যান, কেমন করে গ্রীক রাজারাজড়ারা তাঁকে ফিরিয়ে নেবার জন্যে ট্রয় অবরোধ করেন। আর অডিসী হচ্ছে ট্রয়-অবরোধের শেষে য়ুলিসেস্‌ বা অডিসিয়ুস্-এর দেশদেশান্তরে অভিযানের কাহিনী। এশিয়া মাইনরে, সিন্ধুকূল থেকে অদূরে ছোট্ট শহর ট্রয় অবস্থিত ছিল। আজ আর তার অস্তিত্ব নেই; কিন্তু কবির প্রতিভা তাকে অমর করে রেখেছে।

 এটা লক্ষ্য করবার মতো যে, গ্রীক বা হেলীন্‌রা যখন তাদের সংক্ষিপ্ত কিন্তু চমৎকার সাবালকত্বের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলছিল তখনই আর-একটি শক্তি অনাড়ম্বরে জন্ম নিয়েছিল ভবিষ্যতে গ্রীসকে জয় করে তারই স্থান নেবার জন্যে। রোম নাকি এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কয়েক শত বছর পর্যন্ত বিশ্বের নাটমঞ্চে তার স্থান গৌণই ছিল। কিন্তু যে মহানগরী একদিন সারা ইউরোপের উপরে মাথা উঁচিয়ে ছিল, যাকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘বিশ্বের কর্ত্রী’, ‘চিরন্তন নগরী’ বলে, তার জন্ম একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার বৈকি! রোমের প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে অদ্ভুত সব কিংবদন্তী প্রচলিত আছে,—কেমন করে তার প্রতিষ্ঠাতা রেমাস্ আর রোমিউলাস্‌কে নিয়ে গিয়ে এক নেকড়েবাঘিনী পালন করেছিল। সে গল্প বোধ হয় তুমি জানো।

 রোম-প্রতিষ্ঠার সমসময়েই, অথবা একটু আগে প্রাচীন পৃথিবীর আর-একটি মহানগর গড়ে উঠেছিল। কার্থেজ তার নাম, আফ্রিকার উত্তরকূলে—ফিনিশীয়দের হাতে তার প্রতিষ্ঠা। এক বিশাল সমুদ্রশক্তিতে এ পরিণত হয়েছিল, বহু বছর ধরে রোমের সঙ্গে তার ছিল প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ঘটেছিল তুমলে যুদ্ধ। শেষে রোমেরই জয় হয়েছিল, কার্থেজ নিঃশেষে ধ্বংস হয়ে গেল।

 আজকের মতো শেষ করবার আগে একবার প্যালেস্‌টাইনের দিকে এক পলক তাকিয়ে নেওয়া যাক। অবশ্য প্যালেস্‌টাইন ইউরোপে নয়, তার ঐতিহাসিক প্রাধান্যও অল্প। কিন্তু অনেকে এর প্রাচীন ইতিবৃত্ত সম্পর্কে উৎসাহী, কারণ ওল্ড্ টেস্টামেণ্টে এর নাম রয়েছে। ওল্ড্ টেস্টামেণ্ট্ হচ্ছে ইহুদি জাতের একটা শাখার গল্প, ছোট্ট এই দেশটিতে তাদের বাস ছিল; তাদের পরাক্রান্ত প্রতিবেশী বাবিলনিয়া, আসিরিয়া আর মিশরের সঙ্গে তাদের কেমন করে গোলমাল বেধেছিল, তারই কাহিনী। যদি এ কাহিনী ইহুদিধর্ম ও খৃষ্টধর্মের অঙ্গ না হত, তবে খুব অল্প লোকেই তা জানত।

 এইরকম সময়েই নোসসের পতন হয়। প্যালেস্‌টাইনের একটা অংশ হল ইস্রায়েল, তার রাজা ছিলেন সল। তাঁর পরে আসেন দায়ুদ, তাঁরও পরে সলোমন—তাঁর জ্ঞানের জন্যে তিনি যশস্বী। এ তিনজনের নাম তোমাকে বললাম, কারণ তুমি নিশ্চয় এ’দের কথা শুনেছ বা পড়েছে।